মুহাম্মদ নূরে আলম

দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক শান্তি নিশ্চিত করতে স্থবির হয়ে পড়া ‘সার্ক’ কে পুনরুজ্জীবিত করার এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৬ জুলাই থেকে শুরু করে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য একগুচ্ছ কার্যকর উদ্যোগ বা ‘রোডম্যাপ’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী দ্বিপাক্ষিক বৈরিতা এবং ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের দেয়ালে ঢাকার এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ কতটা সফল হবে; তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এদিকে বর্তমান চেয়ার নেপাল ২০১৪ সাল থেকে কোনো শীর্ষ সম্মেলন না হওয়ায় দীর্ঘ এক যুগ ধরে প্রতীকী নেতৃত্ব দিয়ে সংস্থাটিকে কোনোমতে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। যদিও বিশ্লেষকরা একে অত্যন্ত কঠিন সমীকরণ বলছেন, তবুও জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সাইডলাইন এবং সাংস্কৃতিক-বাণিজ্যিক উৎসবগুলোর মাধ্যমে ট্র্যাক-টু ডিপ্লোমেসি সচল রাখতে পারলে, ঢাকা অন্তত দক্ষিণ এশিয়ায় বহুপাক্ষিক সংলাপের একটি নতুন জানালা উন্মোচন করতে পারবে।

সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার হচ্ছে সার্ককে একটি কার্যকর সংস্থায় রূপ দেওয়া। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ৬ জুলাই ২০২৬ ঢাকার শীর্ষস্থানীয় থিংক ট্যাঙ্ক ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ (বিআইআইএসএস)-এর আয়োজনে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সেমিনারের ডাক দেওয়া হয়েছে। যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। এই সংস্থার মূল প্রবক্তা হিসেবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এবং অব্যবহৃত ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সার্কের পুনরুজ্জীবন চায়। তবে এই উদ্যোগের বিপরীতে সার্কের অন্য অংশীজনদের অবস্থান বেশ জটিল।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সার্কের বর্তমান মহাসচিব রাষ্ট্রদূত গোলাম সারওয়ারের সাথে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর থেকেই এই রোডম্যাপের খসড়া তৈরি করা হচ্ছিল। আগামী ছয় মাসে বাংলাদেশ যে একগুচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে, তার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো: ১. সার্ককে কার্যকর ও পুনঃজাগরিত করতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সার্কভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানদের কাছে বিশেষ দূতের মাধ্যমে বিশেষ বার্তা পাঠানো হবে। ২. ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের (ইউএনজিএ ৮১) সাইডলাইনে নিউইয়র্কে সার্কভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে একটি বিশেষ ‘রিট্রিট’ বা বৈঠকের আয়োজন করবে ঢাকা। ৩. নেপালের কাঠমান্ডুতে অবস্থিত সার্ক সচিবালয়কে জরুরি ‘সিনিয়র অফিসিয়ালস মিটিং’ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বিশেষ বৈঠকের আয়োজন করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হবে। ৪. ট্র্যাক-টু ডিপ্লোমেসি ও উৎসবের আওতায়; আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে সার্ক সাংস্কৃতিক উৎসব, পর্যটন উৎসব, সার্ক বাণিজ্য সম্মেলন (বিনিয়োগ ও বণিক সমিতি), প্রথিতযশা নারী উদ্যোক্তাদের সম্মেলন, সার্ক সাংবাদিক সম্মেলন এবং সার্ক বন্ধুত্বমূলক ক্রীড়া উৎসবের আয়োজন করা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ক্ষমতাধর দেশগুলোর একাধিপত্যের যুগে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো এককভাবে দুর্বল। সার্ক যদি সচল থাকত, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই অঞ্চল একটি পরাশক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে যেত। ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের সুযোগ রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের উপাত্ত এবং জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের গবেষণা অনুযায়ী, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বার্ষিক সম্ভাব্য বাণিজ্যের পরিমাণ ৬৭ বিলিয়ন থেকে ১৭০ বিলিয়ন ডলার হওয়া সম্ভব। অথচ বর্তমানে এই অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ২৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ চায় এই অব্যবহৃত বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে, যা আঞ্চলিক দারিদ্র্য বিমোচনে গেম-চেঞ্জার হতে পারে।

ভারত ও পাকিস্তানের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে ঢাকার এই মহৎ চেষ্টা বড় ধরনের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে বলে মনে করেন সার্ক বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, বাংলাদেশের এই মহৎ উদ্যোগের বিপরীতে সার্কের দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে, যা ঢাকার ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, যা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত উত্তেজনা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে স্থগিত হয়। সার্ককে সচল করতে হলে সবার আগে ইসলামাবাদের সেই ‘ডিউ’ বা স্থগিত হওয়া শীর্ষ সম্মেলনটি আয়োজন করতে হবে। এটি ছাড়া সার্কের পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়।” অন্যদিকে জানাযায়, ভারত বিকল্প হিসেবে ‘বিমসটেক’ -কে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং দিল্লি এই সংস্থাকেই প্রাধান্য দেবে বলে মনে হচ্ছে।”

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. মো: নজরুল ইসলাম বলেন, সার্ক সনদের প্রধান নীতি অনুযায়ী, এই সংস্থাটি কখনোই দ্বিপাক্ষিক বিতর্কিত ইস্যু (যেমন কাশ্মীর বা সীমান্ত বিরোধ) নিয়ে আলোচনা করতে পারে না। কিন্তু ২০১৪ সালে কাঠমান্ডুতে ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের পর গত ১২ বছর ধরে কোনো শীর্ষ সম্মেলন না হওয়ায় বর্তমান চেয়ার নেপাল কার্যত একটি ‘প্রতীকী নেতৃত্ব’ ধরে রেখেছে। “সার্ক মূলত একটি ‘নন-স্টার্টার’ বা স্থবির সংস্থায় পরিণত হয়েছে। ফলে ভারত-পাকিস্তানের এই চরম বৈরিতার মধ্যে সার্ক সচল করার সরকারি এই এজেন্ডা বা উদ্যোগ কতটুকু বাস্তবায়ন হয় এটাই দেখার বিষয়।”

অধ্যাপক রাধা দত্ত (ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি, ভারত) গণমাধ্যমকে বলেন, “আপাতত সার্কের শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার মতো কোনো রাজনৈতিক উপাদান দক্ষিণ এশিয়ায় নেই। কারণ ভারত ও চীন নিজেদের মধ্যে বিরোধ সত্ত্বেও সংলাপ চালায়, কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সমস্ত সংলাপের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ। তবে সার্কের প্রতিষ্ঠাতা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এই আবেগ ও উদ্যোগ ঐতিহাসিক। এর আওতায় শীর্ষ সম্মেলন না হলেও সাব-রিজিওনাল (উপ-আঞ্চলিক) কার্যক্রম বা পর্যটন-সংস্কৃতি উৎসবগুলো চলতে পারে।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনৈতিক বিভাগের মহাপরিচালক ও মুখপাত্র একেএম শাহীদুল কারিম বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও যৌথ আত্মনির্ভরশীলতা জোরদার করার যে স্বপ্ন নিয়ে সার্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশ তার ঐতিহ্যগত ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতির আলোকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সার্ককে সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে।