ইবরাহীম খলিল
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কওমি মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্ত ও গৌরবময় ভূমিকা পালন করে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও, পরবর্তীতে সরকারি বাহিনীর নৃশংসতার প্রতিবাদে ও বৈষম্যবিরোধী জাতীয় দাবিতে তারা রাজপথে সরাসরি সম্পৃক্ত হন। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে কওমি শিক্ষার্থীরা সাধারণ ছাত্রদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। ঢাকার প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ী ও উত্তরাসহ বিভিন্ন পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণে তাদের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা বিপদে পড়া অনেক আন্দোলনকারীকে বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় নিরাপদ আশ্রয় দিতেন। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের জন্য খাদ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবারও ব্যবস্থা করেন। আন্দোলনে অগণিত কওমি আলেম ও শিক্ষার্থী বুলেটবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন এবং আহত হন।
জুলাইয়েল দেনাপাওনা নিয়ে দৈনিক সংগ্রামের সাথে কথা বলেন, জুলাইযোদ্ধা মুস্তাঈন বিল্লাহ হাবিবী। তিনি বলেন, আন্দোলনে কওমি শিক্ষার্থীরাও মাঠে ছিলেন সদর্পে। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো কওমি শিক্ষার্থীরাও মাঠে ছিলেন আন্দোলনের পরতে পরতে। শুরুর দিকে আমরা বিষয়টিকে সেই অর্থে গুরুত্ব দিয়ে দেখিনি। কিন্তু ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। সেদিন থেকেই কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন।
তিনি বলেন, কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ভূমিকার কথা বলতে গেলে বলতে হয়Ñ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস যদি কেউ নিরপেক্ষভাবে লিখতে চান, তাহলে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের অবদান বাদ দিয়ে সেই ইতিহাস লেখা কখনোই সম্ভব নয়। এই বিপ্লবে কওমি শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি বলেন, আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, ১৮ জুলাই আমাদের একজন শিক্ষক বলেছিলেন, “তোমাদের মধ্যে কয়েকজন পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে যাবে, আর কয়েকজন ট্রাউজার ও গেঞ্জি পরে যাবে।” এর উদ্দেশ্য ছিলÑতৎকালীন সরকার যেন এই আন্দোলনকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের আন্দোলন হিসেবে অপপ্রচার করার সুযোগ না পায়।
এরপর আমরা কওমি, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। ঐক্যবদ্ধ সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে আরও বেগবান হয়। পরবর্তীতে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার সূচনা ঘটে।
আন্দোলনে ব্যক্তিগত অংশ গ্রহণ নিয়ে মুস্তাঈন বিল্লাহ হাবিবী বলেন, আমি জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ-এ দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় আমি জামিয়া আরাবিয়া বাইতুস সালাম, উত্তরা (সেক্টর-২), ঢাকা-এর ছাত্র ছিলাম।) আমি সবসময় চেষ্টা করি, কোনো বিষয়ে অবস্থান নেওয়ার আগে সেটিকে বুঝতে, জানতে এবং বিচার করতে। ২০২৪ সালের কোটা-বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
জুলাই মাসের শুরুতে (২ বা ৩ জুলাই) ব্যক্তিগত কাজে নীলক্ষেতে গিয়েছিলাম। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অস্বাভাবিক রকমের আন্দোলন চোখে পড়ে। আশেপাশের লোকজনের কাছ থেকে জানতে পারলাম, দেশে কোটা-বিরোধী আন্দোলন চলছে। সে সময় আমার কাছে অ্যান্ড্রয়েড ফোন না থাকায় বিষয়টি আগে জানা ছিল না। মাদরাসায় ফিরে আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত পড়াশোনা করি। ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের ইতিহাস, এর পটভূমি ও দাবিগুলো জানার চেষ্টা করি। আমার কাছে আন্দোলনের দাবি যৌক্তিক মনে হয়।
২০১৩ সালের শাপলা চত্বর এবং ২০২১ সালের মোদি-বিরোধী আন্দোলনেও আমি অংশ নিয়েছিলাম। সেই আন্দোলনে আহত হয়ে আমার মাথায় চারটি সেলাইও লেগেছিল। এই ধারাবাহিকতায় আমি মনে করি, ২০২৪ সালের কোটা-বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়ানো আমার নৈতিক দায়িত্ব।
উত্তরায় মূলত ১৬ জুলাই থেকে আন্দোলন তীব্র হতে শুরু করে। ১৬ ও ১৭ জুলাই কিছু সময় আন্দোলনে অংশ নিলেও ১৮ জুলাই থেকে নিয়মিতভাবে যুক্ত থাকি। ১৯ জুলাই, শুক্রবার। জুমার নামাজের পর কিছুক্ষণ রাস্তায় ছিলাম। পরে মাদরাসায় ফিরে আসি। আসরের নামাজ শেষে আবার আন্দোলনের উদ্দেশ্যে বের হই।
আমার ক্যাম্পাস ছিল র্যাব-১-এর পূর্ব পাশে। আমি পশ্চিম পাশে রাজলক্ষ্মীর দিকে এগোচ্ছিলাম। পথিমধ্যে ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী আমাকে আটকিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। পরে জানতে পারে আমি আন্দোলনে যোগ দিতে যাচ্ছি। তখন তারা আমাকে লাঠি দিয়ে মারধর করে এবং মাটিতে ফেলে দেয়। তারা হয়তো ভেবেছিল, এই আঘাত আমাকে ভয় পাইয়ে দেবে। কিন্তু কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমি আবার উঠে দাঁড়াই এবং আজমপুরের দিকে রওনা হই, যেখানে আন্দোলনরত ছাত্রদের মূল সমাবেশ ছিল। গুলীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো আজমপুরে পৌঁছে দেখি চারদিক গুলীর শব্দে প্রকম্পিত। পুলিশের পোশাকধারী সদস্যদের পাশাপাশি সিভিল ড্রেসধারী সশস্ত্র ব্যক্তিরাও বারবার গুলী চালাচ্ছিলেনÑএমনটাই আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।
আমরা ক্রিসেন্ট রোড এলাকায় অবস্থান করছিলাম। বারবার গুলীর মুখে আমাদের পিছু হটতে হচ্ছিল। আহতের সংখ্যা বাড়ছিল, কিন্তু সামনে এগোনোর সুযোগ মিলছিল না। একপর্যায়ে আমাদের দলের একজন ভাই সবাইকে একত্র করে বললেনÑ "এভাবে পিছিয়ে গেলে কোনো লাভ হবে না। আমাদের সামনে এগোতেই হবে।"আরেকজন বললেন, "আপনি সহজে বলছেন। একটা গুলী গায়ে লাগলে বুঝতেন সামনে যাওয়া কত কঠিন।"তখন সেই ভাই নিজের শার্ট খুলে পিঠ দেখালেন। তার পিঠ অসংখ্য ছররা গুলীর দাগে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। তবুও তিনি কাউকে ভয় না পেয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিলেন।সেই দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে।আমি বললাম,"ভাই, আমি আপনার সঙ্গে যাব।"পেছন থেকে আরও কয়েকজন এগিয়ে এলেন। মুহূর্তটি ছিল অদ্ভুত।অনেকের চোখে পানি, কিন্তু কেউ কান্না করছিল না। সবাই হাসিমুখে মৃত্যুর দিকেই যেন এগিয়ে যাচ্ছিল। টিনের ঢাল ঠিক তখনই ফুটপাত থেকে এক তরুণ দৌড়ে এসে বলল,"ভাই, সামনে যাইতেছেন? তাহলে এটা নিয়ে যান, কাজে লাগবে।"সে একটি বড় ভারী টিনের পাত এনে আমাদের হাতে তুলে দেয়। আমরা সেটিকে সামনে রেখে এগোতে শুরু করি।কিন্তু কিছুক্ষণ পরই চারদিক থেকে আবার গুলীবর্ষণ শুরু হয়। টিনে একের পর এক গুলী লাগতে থাকে। ভয়ে সামনে থাকা দুইজন ভাই টিনটি ছেড়ে দিলে আমাদের অস্থায়ী প্রতিরোধ ভেঙে যায়।
এরপর অসংখ্য ছররা গুলী এসে আমার শরীরে লাগে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি আসল (অক ৪৭) বুলেট আমার হাতে আঘাত করে। হাত ভেঙ্গে হাড় বেড়িয়ে যায়,আর অনর্গল রক্ত ঝরতে থাকে। তবুও আমি জ্ঞান হারাইনি। আজও ভাবিÑসেদিন আল্লাহ কোথা থেকে সেই শক্তি দিয়েছিলেন! রক্তে হাত ভিজে যাচ্ছিল। অবশেষে কয়েকজন সহযোদ্ধা আমাকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের সেই ভয়ংকর রাত আমাকে উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আরও বহু গুলীবিদ্ধ মানুষ চিকিৎসাধীন ছিলেন।
আমার স্মৃতিতে আছে, কিছুক্ষণ পর একদল অস্ত্রধারী ব্যক্তি হাসপাতালে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায় এবং আহতদের লক্ষ্য করে হুমকি দেয়। পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভীতিকর। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা অনেক অনুরোধ ও কান্নাকাটি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তারা সেখান থেকে চলে যায়। ভয়ে অনেকেই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা না নিয়েই হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। আমিও শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে মাদরাসায় ফিরে আসি। হাতে ব্যান্ডেজ করা হলেও গুলীটি বের করা সম্ভব হয়নি। আজও সেই গুলী শরীরে । ২৬ জুলাই আমি গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় চলে যাই।
আজও সেই গুলী শরীর থেকে বের করা সম্ভব হয়নি।এটি শুধু একটি ক্ষত নয়Ñ এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য। আমি যে স্বপ্ন নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলাম, তা ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন। যেখানে মেধা, পরিশ্রম ও যোগ্যতাই হবে অগ্রগতির একমাত্র মানদ-। যেখানে মত প্রকাশ, প্রশ্ন কিংবা প্রতিবাদ রাষ্ট্রদ্রোহ নয়; বরং গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি পাবে। যেখানে মাদরাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সমান মর্যাদায় রাষ্ট্রের অংশীদার হবে। আমি বিশ্বাস করিÑইতিহাসের প্রতিটি ন্যায়সংগ্রাম সময় নিয়েছে। তাই আমি এখনো আশাবাদী। ইনশাআল্লাহ, একদিন এই দেশের মানুষ একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।
আমি যেহেতু কওমি মাদরাসার একজন শিক্ষার্থী তাই কওমি অঙ্গন নিয়ে আমার প্রত্যাশা আমি চাই, ভবিষ্যতের বাংলাদেশে কওমি মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা শুধু ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না; বরং রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে নৈতিক নেতৃত্ব দেবেন। তারা হবেন সত্য, ইনসাফ ও জনকল্যাণের পথপ্রদর্শক। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে তাদের চিন্তা ও মূল্যবোধ যথাযথ মর্যাদা পাবে। আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে কওমি অঙ্গনকে কেবল একটি শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং নৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে।
সরকারকে প্রথমেই বলবÑআমার মতো এবং আমার চেয়েও গুরুতর আহত অনেক জুলাই যোদ্ধা এখনো যথাযথ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। তারা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে, এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারছেন না। আমি অনুরোধ করব, তিনি যেন বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হন।
দ্বিতীয়ত, আমাদের জন্য যে মাসিক সম্মানী ভাতা নির্ধারিত রয়েছে, সেটি নিয়মিত ও নির্ধারিত সময়ে প্রদান করা হয় না। ফলে অনেক কর্মক্ষমতা হারানো বা কর্মঅক্ষম জুলাই যোদ্ধা জরুরি প্রয়োজনে সেই অর্থ ব্যবহার করতে না পেরে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তাই আমার বিনীত অনুরোধ, তিনি যেন এই বিষয়টির প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং ভাতা নিয়মিত ও সময়মতো প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন।