জুলাই শহীদ স্মরণে সাক্ষী হয়েছি চোখের সামনে নাম না জানা অনেক শহীদের। শত শত শহীদের মধ্যে তা’মীরুল মিল্লাত হারিয়েছে ৫ টি তাজা প্রাণ। পাঁচটি পরিবারেই যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। শুনেছি গল্প, অনুপ্রাণিত হয়েছি শহীদদের ঈমান আর দেশপ্রেমের স্পৃহায়। ২০২৪ এ তখন আমি তা’মীরুল মিল্লাত কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (টাকসু)র তৎকালীন ভিপি। ভিপি হিসাবে ছাত্রদের নিরাপত্তা, আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ, সবাইকে নিয়ে অংশগ্রহণ, দেখাশোনাসহ সরাসরি ময়দানে দায়িত্ব পালনের সুযোগ হয়েছে। শুধু এই আন্দোলনকেন্দ্রিক টঙ্গী পশ্চিম থানায় আমার নামে মামলা হয় ৪ টি। ৩টাতেই প্রধান আসামী করা হয়। প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে প্রশাসন থেকে চাপ দিয়ে। বাহিরের ছাত্রাবাসগুলোতেও পুলিশ রেইড দিচ্ছে। প্রতিদিনই সকাল-সন্ধ্যা কয়েক গাড়ি যৌথবাহিনী ক্যাম্পাসে সতর্ক অবস্থানে থাকতো। মাদরাসার একটি গেইট প্রশাসনের লোকেরা দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেয়। সার্বিক দিক বিবেচনায় জুলাই আন্দোলনে মিল্লাতের সকল ছাত্রকে নিয়ে আমরা অংশগ্রহণ করতাম উত্তরা আজমপুর বিএনএস সেন্টারের সামনে। আন্দোলনকে যেন জামায়াত শিবিরের আন্দোলন বলতে না পারে এজন্যই এতদূরে আসতাম। এমনকি সবাইকে বলে দেয়া হতো কেউ যেন পারতপক্ষে পাঞ্জাবি টুপি পরিধান না করে আসে। যেহেতু মাদরাসাটি জামায়াত শিবিরের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এই কৌশলগত অবস্থানগুলো এই জুলাই বিপ্লবসহ আগের আন্দোলনগুলোতেও মেনে চলা হতো। মাদরাসাটির শুধু টঙ্গী ক্যাম্পাসেই রানিং ১৪,০০০ এর বেশি ছাত্র আছে। এই জুলাই বিপ্লবে তা’মীরুল মিল্লাত মাদরাসা থেকে মোট ৫ জন শাহাদাত বরণ করেন। ১। শহীদ হাফেজ নাসির ২। শহীদ ওসমান পাটোয়ারী ৩। শহীদ শাকিল পারভেজ ৪। শহীদ মো. আদিল ৫। শহীদ মুনতাসির রহমান আলিফ। মেজর মাইনরসহ আহত সব মিলিয়ে ৩০০ এর বেশি। একটা সময় বিজয় ধরা দিলো। কিন্তু এই ২০ দিনে গোলাগুলীর শব্দে দীর্ঘদিন ট্রমাটাইজড থাকতে হয়েছে। ঘুমের মধ্যেও গোলাগুলীর শব্দ শুনতাম। হালকা কোন শব্দেও আঁতকে ওঠতাম। এরকম সিচুয়েশন অনেকেরই হয়েছে। এতো রক্ত, এতো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতাকে যেকোনকিছুর বিনিময়ে সার্থক করতে হবে। এটা শহীদও আহতদের রক্তের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা।
শহীদ ওসমান পাটোয়ারী
শাহাদাত বরণ করেন ফতহে গণভবনের আগেরদিন ৪-ঠা আগস্ট। ৩-রা আগস্ট মা-কে বললেন পিঠা খাবে। তাকে দিয়েই বাজার থেকে চালের গুড়ি আনানো হলো। পিঠা তৈরী হচ্ছে এদিকে ওসমান আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত। মা বললেন বাবা ওসমান! মায়ের খেদমতে থাকাও জিহাদ। পাল্টা রিপ্লাই করলেন মা শুনো- রাসূল (সা.) যেই সাহাবীকে এই কথা বলে রেখে গেছিলেন সেই সাহাবীর মা অসুস্থ ছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ আমার বাবা-মা দুজনই সুস্থ। আমার বড় ভাইয়া অনেক ভালো তোমাদেরকে কখনো কষ্ট দিবে না। তোমরা কি শহীদের মা-বাবা হতে চাও না। বুঝিয়ে পারা গেলো না ওসমানকে। বড় ভাই, বোন সবার থেকে ফোনে মাফ চেয়ে অযু-গোসল করে বের হলেন আন্দোলনে। মনে হয় যেন সে শহীদ হতে যাচ্ছে আল্লাহ হয়তো আগেই জানিয়ে দিয়েছেন। বললেন মা আমি শহীদ হলে আমাকে গোসল দেওয়াবা না। কারণ শহীদদেরকে গোসল দেয় না। শেষ মুহূর্তে মা বললেন বাবা! পিঠা খেয়ে যা। ওসমান বললেন মা! এসে খাবো। মায়ের কপালে চুমু খেয়ে বের হলেন। ফিরে আসলেন শহীদ হয়ে। সোস্যাল মিডিয়ায় তাঁর কণ্ঠে গাওয়া একটি গান বেশ প্রাচারিত হয়েছিল। “তোরা সাজিয়ে গুজিয়ে দে মোরে সজনি, বরই পাতার গরম জলে শুয়াইয়া দে মশারির তলে....” ।
শহীদ নাসির ইসলাম
বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। নাসিরের ছোট ২ বোন আছে। তাঁদের থেকে শুনছিলাম ভাই-বোনের কত মিষ্টি গল্প। থাকতেন তা’মীরুল মিল্লাতের ছাত্রাবাসে। শেষবার বাসা থেকে আসার সময় বোনকে বলেছিলেন তোর একটা জিনিস নিয়ে যাচ্ছি। বোন আবেগতাড়িত হয়ে জানাচ্ছিলেন, অনেক খুঁজেছি! কি নিয়েছে কিছুই খুজেই পাইনি। ভাই চলে যাওয়ার পর বুঝতে পেরেছি ভাই নিজেই আমার থেকে চলে গেছে। সর্বকনিষ্ঠ ছোট বোন কানতে কানতে বললেন, স্কুলে গিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে থাকি! সবার ভাই আছে। আমার ভাই আর নাই। কখনো আসবে না। শহীদ নাসির ছিলেন একজন কুরআনের হাফেজ। শিক্ষক ছাত্র সহপাঠী সবার কাছে অত্যন্ত ভদ্র, পরহেযগার হিসাবেই সমাদৃত ছিলেন। ২০ জুলাই’২৪ আন্দোলন চলছে তা’মীরুল মিল্লাতের সামনে। হেলিকপ্টার থেকে যখন গুলী হচ্ছে। তখন রুমমেটকে বলছিলেন, আর বসে থাকা যাবে না। তা’মীরুল মিল্লাতের উপর ওদের চোখ পরেছে। এই অকুতোভয় মেধাবী ছেলেটি নেমে আসলেন রাস্তায়। পুলিশের গুলীতে পান করলেন শাহাদাতের পেয়ালা। লাশ নিয়ে পুলিশের হয়রানি। বাবা-মায়ের কত ভয়। তা’মীরুল মিল্লাতের শিবিরের দায়িত্বশীলদের নামে মামলার চাপ প্রয়োগ। শেষমেষ বাবা থানায় বললেন আমার ছেলের কোন বিচার চাই না। ডায়রি করে ছেড়ে দেন। গ্রামে নিয়ে খুবই ছোট পরিসরে দাফন কাফন করে জানাযা শেষ করা হলো হাফেজ শহীদ নাসির ইসলামের। জুলাই শহীদ নাসিরের স্মৃতিকে ধারণ করে তা’মীরুল মিল্লাতের একটি গেট শহীদ নাসির গেট নামকরণ করা হয়েছে।
শহীদ শাকিল পারভেজ
নাসিরের মতোই একমাত্র ছেলে। বাবা মুদির দোকানদার। মা দীর্ঘদিন প্যারালাইজড। অসুস্থ মা-কে মুখে খাবার তুলে খাইয়ে দিতেন শাকিল ভাই। শিবির করতেন। গাজীপুর মহানগর শিবিরের দায়িত্বশীল ছিলেন। খুব ভালো স্লোগান দিতেন। তাই সব আন্দোলনেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন। ১৮ জুলাই’২৪ উত্তরা বিএনএস সেন্টারের সামনে থেকে যখন নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হঠাতই ফ্যাসিবাদের ছোড়া গুলী ছিদ্র করে যায় শহীদ শাকিলের বুক। প্রশাসনের চাপ সইয়ে শত শত উপস্থিতি নিয়ে জানাযা আদায় করা হলো মিল্লাতের পাশে ট্রাস্ট মসজিদের সামনে। অসুস্থ মা আর দরিদ্র বাবার চোখের পানি থামানোর পদ্ধতি কি কারো জানা আছে? পরিবারের একমাত্র ছেলেটিকে আল্লাহ নিয়ে গেলেন। বাবা যেন কোনভাবেই বিশ্বাস করতে চান না। আল্লাহ হয়তো বাগানের সবচেয়ে সেরা ফুলটিকেই শহীদ হিসাবে কবুল করেন।
শহীদ মুনতাসির রহমান আলিফ
একটি মাত্রই ছেলে বাবা-মায়ের। নেই কোন মেয়েও। আলিফ তা’মীরুল মিল্লাত যাত্রাবাড়ি শাখার ছাত্র। একাধারে ছাত্রশিবিরের সাথী। আবার ইসলামী গানের একজন চমৎকার শিল্পী। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখে পেয়েছেন পুরস্কারও। স্বপ্ন ছিল মিশরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় অথবা মক্কা-মদিনার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে। সব স্বপ্ন ছাপিয়ে আপাতত শুধু দেশকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করার স্বপ্নে বিভোর হয়ে গিয়েছিল আলিফ। বাবা-মায়ের অনুমতি না পেয়ে বাসার সবার দৃষ্টি এড়িয়ে বের হয়ে পরেন একাই। বাবা-মা হন্ন হয়ে খুজতে বের হয়ে যাত্রাবাড়ির প্রত্যেকটি অলিগলিতে ছুটে বেড়িয়েছেন। জীবিত পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে সংগঠনের ভাইদের পরামর্শে ছুটে চললেন ঢাকা মেডিকেলের মর্গে। অজ্ঞাত লাশের স্তূপ। দেখতে দেওয়া হবে না কোনভাবেই। বাবা বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন রিটায়ার্ড অফিসার। অনেক সুপারিশ পর অনুমতি পেলেন। দূর থেকে দেখেই মনে হলো এটা আমার আলিফ। মাথা থেতলানো, রক্তাক্ত। তাই চেহারা দেখতে দেওয়া হবে না। পায়ের এদিক দিয়ে পাজামা দেখে নিশ্চিত হলেন এটাই আমার কলিজার টুকরা ছেলে শহীদ সাইয়্যেদ মুনতাসির রহমান আলিফ। নাম পরিচয়হীন নিথর দেহখানা পরে আছে মেডিক্যালের মর্গে। লাশ ঢেকে রাখা হয়েছে সবুজের মধ্যে লাল বৃত্তের রক্তাক্ত এক পতাকা দিয়ে। এটাই তাঁর শেষ পরিচয় দেশের জন্য জীবন দেয়া বীর শহীদ মুনতাসির রহমান আলিফ। কিন্তু সন্তান হারানো বয়স্ক বাবা-মা কি নিয়ে বাকী জীবন কাটাবেন? বাবা-মায়ের অশান্ত মনকে পুরো পৃথিবী এনে দিয়েও কি শান্ত করা সম্ভব?
শহীদ মোহাম্মদ আদিল
উচ্চতায় প্রায় ৬ ফিট। স্বপ্ন! বড় হয়ে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী অফিসার হবে সে। শাহাদাতের আগের দিন ১৯ জুলাই শুক্রবার রাতে বাবাকে বলেছিলেন নান-গ্রিল খাবে। বাবার ব্যস্ততায় গ্রিল আর আনা হলো না। ছোট্ট নিম্নবিত্ত পরিবার। যাত্রাবাড়ি থেকে মিল্লাত ক্যাম্পাস বেশ দূরে হওয়ার পরও নিয়মিত পায়ে হেটে ক্লাস করতে যেতেন। বড় ভাইয়ের ব্যবহৃত কাপড় পরিধান করতেন। কখনো বিলাসিতা খুজে পায়নি আদিলকে। ১৯ তারিখ রাত ৩ টা, ছটফট করতে করতে ঘুম থেকে ওঠে গেল। অযু করে তাহাজ্জুদ আদায় করলেন। মাকে জাগিয়ে দিলেন তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য। সকাল হতেই সামান্য নাস্তা করে আন্দোলনে বেরিয়েছেন দেশপ্রেমের দায়িত্ব নিয়ে। বেলা গড়াতেই খবর আসে আদিল গুলীবিদ্ধ হয়েছে। ঠিক বুকের ডান পাশ সামনের দিক থেকে ছিদ্র হয়ে পিছন দিয়ে বের হয়ে গেছে স্টিল বুলেট। বাবা কান্না করছিলেন এই বলে, যদি জানতাম আমার ছেলে এভাবে চলে যাবে তাহলে পৃথিবীর যেকোন জায়গা থেকে হলেও গ্রিল এনে খাওয়াতাম। আর মায়ের রোনাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে যাচ্ছে। বলছিলেন, গ্রিল দেখলে কলিজাটা ফেটে যায়। মায়ের এই কলিজা জোড়া লাগবে কিসে? সেনাবাহিনী অফিসার হতে না পারলেও দেশপ্রেমে অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে শহীদ আদিল।
এই শহীদেরা দল মতের ঊর্ধ্বে ওঠে আমাদের দেশের বীর সন্তান। তারা দেশপ্রেম, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধের অনন্য উদাহরণ। যেই স্বপ্ন নিয়ে শহীদেরা নিজের জীবনের মায়া ছেড়ে দিয়ে দেশের তরে হয়ে ওঠেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব বেচে থাকা প্রত্যেকটি নাগরিকের। আল্লাহ এই শহীদদের জান্নাতে সুউচ্চ মাক্বাম দান করুন। তাঁদের তাজা রক্তের বিনিময়ে পাওয়া নতুন স্বাধীন বাংলাদেশকে নিরাপত্তার চাদরে আবৃত রাখুন। ফ্যাসিবাদ যখন মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেয়া, ভোটের নামে নাটক, চারপাশে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতির মহীরুহ, গুম, খুন, নির্বিচারে হত্যা, বিচারিক আদালত থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রত্যেকটি জায়গা দলীয়করণ করা যখন নিয়ম বানিয়ে নিয়েছে তখনি মানুষের সহ্য ক্ষমতা চরমে পৌছে। যেকোন ইস্যুই শুরু হলে প্রত্যেকটি দেশপ্রেমিকের হৃদয়ে থাকে এই ফ্যাসিবাদী আচরণের স্থায়ী সমাপ্তি। তারই ধারবাহিকতায় আসে জুলাই বিপ্লব। নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ। যেখানে মানুষ মনখুলে হাসতে কাঁদতে পারে, নিশ্বাস নিতে পারে মুক্তবাতাসে।