তুর্কি সামরিক ড্রোন প্রযুক্তি ও যৌথ বিনিয়োগের হাতছানি; বাংলাদেশ ও তুরস্কের দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও বন্ধুত্বের ইতিহাসে এক নতুন ও সোনালী অধ্যায়ের সূচনা হলো। কারণ তুরস্ক বাংলাদেশকে আধুনিক সামরিক প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী করতে চায়। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে পর্যটন ব্যবসা বাড়বে এবং বাংলাদেশিদের জন্য তুরস্কের ভিসা প্রাপ্তি আগের চেয়ে অনেক সহজ ও গতিশীল হবে। তুরস্কের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান এবং বর্তমান প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের দুদিনের ঢাকা সফর দেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে এক বিরাট মাইলফলক। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় এবং মুসলিম বিশ্বের পরাশক্তি তুরস্কের কোনো উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে এটিই প্রথম সফর। একজন সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে কূটনীতিবিদ সবার মাঝেই এই সফর নিয়ে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে দুদিনের ঢাকা সফরে আসেন হাকান ফিদান। গতকাল শনিবার সফর শেষ করে ঢাকা ত্যাগ করেন তিনি। এদিকে ঢাকা সফর শেষে এক বার্তায় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের এশিয়া-প্যাসিফিক সফরের চতুর্থ ও শেষ গন্তব্য বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের অভ্যর্থনা জানান। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, তুরস্ক ও বাংলাদেশের বন্ধুত্ব হলো এমন দুটি জাতির বন্ধুত্ব, যারা সাধারণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে কঠিন সময়ে সংহতি প্রদর্শন করে। আমরা এই বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করতে থাকবো। গতকাল শনিবার এক বার্তায় তিনি এ কথা বলেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন, তার বিজয়ের পেছনে তুরস্কের অত্যন্ত শক্তিশালী, কৌশলগত ও প্রকাশ্য সমর্থন ছিল। তুরস্কের এই জোরালো লবিং ও অকুণ্ঠ সমর্থন আন্তর্জাতিক মঞ্চের এই সম্মানজনক চেয়ারে বাংলাদেশের আসীন হওয়াকে অনেক বেশি সহজ ও নিশ্চিত করেছে।
প্রতিরক্ষা সম্পর্কে নতুন মাত্রা; আসছে ‘বায়রাক্তার ড্রোন’ ও আধুনিক প্রযুক্তি: বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার সামরিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন আর সাধারণ স্তরে নেই, এটি এক নতুন ও কৌশলগত উচ্চতায় পৌঁছেছে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এই সফরে দুই দেশের মধ্যে যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, বিশ্বখ্যাত ‘বায়রাক্তার ড্রোন’ এবং আধুনিক গাইডেড রকেটসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সরবরাহ নিয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে হাকান ফিদানের এই সফরে। তুরস্ক বাংলাদেশকে আধুনিক সামরিক প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী করতে, প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে এবং যৌথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমাদের ডিফেন্স সেক্টরকে আরও আধুনিকায়ন করতে পূর্ণ সম্মতি জানিয়েছে।
তুরস্কের তৈরি ‘বায়রাক্তার টিবি-২’ বা ‘আকিনসি’ (অশরহপর) ড্রোন বর্তমানে সারা বিশ্বে আধুনিক যুদ্ধের নকশা বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী ইতিমধ্যে তুরস্কের কাছ থেকে সামরিক ড্রোন ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা শুরু করেছে। কিন্তু শুধু ড্রোন কেনা আর দেশে ড্রোন তৈরি করার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। বাংলাদেশ যদি তুরস্কের কারিগরি সহায়তায় দেশের মাটিতেই একটি ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপন করতে পারে, তবে তা হবে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অর্জন।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের এই সফরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার যে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে, তার অন্যতম প্রধান শর্ত হওয়া উচিত প্রযুক্তি হস্তান্তর। এর মানে হলো, তুরস্ক কেবল আমাদের কাছে ড্রোন বিক্রি করবে না, বরং ড্রোন তৈরির প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়ার ও সামরিক বিজ্ঞানীদের শিখিয়ে দেবে। গাজীপুরের বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা বা অন্য কোনো বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে এই কারখানা স্থাপন করা সম্ভব বলে মতামত বক্ত্য করেছেন কূটনৈতিক বিশেসজ্ঞরা।
বিদেশ থেকে তৈরি ড্রোন আমদানি করতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার খরচ হয়। দেশে কারখানা হলে সেই খরচ অর্ধেক বা তারও বেশি কমে যাবে। বাংলাদেশ শুধু নিজের প্রয়োজনেই ড্রোন তৈরি করবে না, ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর কাছে এই ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ তুর্কি ড্রোন রপ্তানি করে কোটি কোটি ডলার আয় করতে পারবে। এই ধরনের হাই-টেক বা উচ্চ-প্রযুক্তি শিল্পে বাংলাদেশের শত শত তরুণ প্রকৌশলী, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং মেকানিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিগত আমলের একক দেশ-কেন্দ্রিক সামরিক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে তুরস্কের মতো মুসলিম বিশ্বের একটি স্বাধীন পরাশক্তির সাথে ড্রোন প্রযুক্তির অংশীদার হওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে এক মহাসড়ক এনে দেবে। ড্রোন প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হলে বঙ্গোপসাগর, ব্লু-ইকোনমি এবং আমাদের সীমান্ত সুরক্ষায় বাংলাদেশ কারো ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব শক্তি প্রদর্শন করতে পারবে।
বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা ২ বিলিয়ন ডলার ও সংস্কৃতি বিনিময়: বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই সফরকালে দুই দেশের বাণিজ্যকে দ্রুত ১.৫ বিলিয়ন থেকে ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা ও ব্যবসায়িক চুক্তি নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক, ঐতিহাসিক বন্ধন ও পর্যটন খাতকে আরও গাঢ় করতে একটি বিশেষ ‘সংস্কৃতি বিনিময় চুক্তি’ও সই হয়েছে, যা দুই দেশের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, পাট ও চামড়াজাত পণ্য তুরস্কের বিশাল বাজারে আরও সহজে প্রবেশ করতে পারবে। তুরস্কের বড় বড় শিল্পগ্রুপ বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ভারী শিল্প, অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তুরস্কের ভূমিকা ও ক্যাম্প পরিদর্শন: তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান তার এই সফরে সরাসরি কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান। সেখানে তিনি তুর্কি দাতা সংস্থাগুলোর (যেমন: টিকা, এফাদ, তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট) মানবিক সহায়তার কাজ এবং তুর্কি ফিল্ড হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ঘুরে দেখেন। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে এবং মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে থেকে আরও জোরালো ও অগ্রণী ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিয়েছে। উদ্বেগ ও সম্ভাবনার এই পুরো বৈশ্বিক প্রক্রিয়াটি মূলত শুরু হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময় থেকেই ইন্টারেস্টিংলি, বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের হাত ধরেই এই কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো প্রাণ পায়। ড. খলিলুর রহমান যেহেতু এখন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং একই সাথে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের হবু সভাপতি, তাই আন্তর্জাতিক মহলে তার ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রোফাইল দিনে দিনে আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশা, তার এই অভিজ্ঞতার আলোকেই আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে আরও ভালো করবে।
প্রধানমন্ত্রী ও জামায়াত আমীরের সাথে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক: সফরকালে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে তাঁর কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষ নেতা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া, হাকান ফিদান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সাথেও একটি বিশেষ বৈঠক করেন, যেখানে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, দ্বিপাক্ষিক সৌহার্দ্য এবং পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘে আমাদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পেছনে তুরস্কের অবদান আমরা সবসময় কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি। হাকান ফিদানের এই সফর প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং প্রতিরক্ষা খাতে আমরা একযোগে কাজ করবো।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. অধ্যাপক সাহাবুল হক বলেন, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সাধারণ কোনো কূটনীতিক নন, তিনি দেশটির সাবেক সফল ও দীর্ঘমেয়াদী গোয়েন্দা প্রধান। তার এই সফর বাংলাদেশের জন্য ভূ-রাজনীতিতে এক বিরাট প্লাস পয়েন্ট। অতীতের স্থবির ও একঘেয়ে পররাষ্ট্র নীতি ভেঙে এখন আমাদের তুরস্কের মতো পরাশক্তিদের সাথে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান যেহেতু নিজে দীর্ঘদিন দেশটির গোয়েন্দা প্রধান ছিলেন, তাই তিনি প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও কৌশলগত গুরুত্ব খুব ভালো বোঝেন। বাংলাদেশ সরকারের উচিত এই সফরের সুফল ধরে রেখে তুরস্কের সরকারি ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘বায়কার’ কে বাংলাদেশে যৌথ কারখানা স্থাপনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেওয়া এবং বিশেষ সুবিধা প্রদান করা।
তুরস্ক-বাংলাদেশের বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করতে থাকবো-হাকান ফিদান: ঢাকা সফর শেষে এক বার্তায় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে আমরা বিস্তারিত বৈঠক করি। আমাদের পুরো সফরজুড়ে আমরা ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর এক নতুন যুগে পদার্পণকারী বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশি ভাই-বোনেরা যাতে শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতায় বসবাস করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার জন্য গৃহীত ব্যাপক প্রচেষ্টা প্রত্যক্ষ করেছি। আমরা দেখেছি যে, আমাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দুদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ় ভিত্তির ওপর গড়ে উঠছে। আগামী সময়ে আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা আরও উন্নত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং একই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বাংলাদেশি ভাই-বোনেদের সমর্থন অব্যাহত রাখবো। উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য আমি বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ ও জনগণকে, বিশেষ করে আমার শ্রদ্ধেয় ভাই ড. খলিলুর রহমানকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। হাকান ফিদান বলেন, আমাদের সফরের অংশ হিসেবে আমরা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করার সুযোগও পেয়েছি। ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ এক বিরাট দায়িত্ব পালন করছে। রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান খুঁজে বের করাই আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য। উল্লেখ্য, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত বৃহস্পতিবার রাতে তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন। সফর শেষে শনিবার ঢাকা ছাড়ছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।