আমাদের প্রত্যাশা ছিল দেশটা পরিবর্তনের। দেশের মানুষের কালচার পরিবর্তনের। দেশের মানুষের ভেতরে ন্যায় এবং ইনসাফের আকাক্সক্ষা তৈরি করার। কিন্তু আমরা কিছুই পরিবর্তন করতে পারিনি। আমরা পরিবর্তন করেছি শুধু সরকার। তবে আমি বর্তমান সরকারকে জানাতে চাই, তিনি আমাদের কষ্ট, আমাদের মায়েদের কান্না, হাহাকার, জুলাইযোদ্ধাদের আহাজারি, হাত-পা হারানোদের চিকিৎসা এবং সম্মান দেওয়া হোক। দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে এক নিঃশ্বাসে এই দাবিগুলো করলেন শহীদ ফাহমিন জাফরের মা কাজী লুলুল মাখমিন।
তিনি আরও বললেন, জুলাই সনদ কার্যকর করা হোক। আমরা আর কাঁদতে চাই না। ভিক্ষার জন্য আর কারো দ্বারে দ্বারে যেতে চাই না। আমরা আমাদের সন্তান হারানোর সঠিক বিচার চাই। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমি বলবো অন্যায়ের সঠিক বিচার না হওয়ার কারণে দেশে চুরি-ছিনতাই লুটতরাজ-রাহাজানি অব্যাহত আছে। ধর্ষণ আরও বেড়ে গেছে। শুধু বিচারের অবহেলার কারণে এসব অব্যাহতভাবে ঘটছে। খুনিরা খুন করেও তিন বছরের মধ্যে বেরিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে মানুষের ভেতর থেকে ডর-ভয় উঠে গেছে। খুনিরা মনে করছে খুন করলে আর কি হয়? এজন্য আমি চাই জুলাই হত্যার বিচারটা সঠিকভাবে হোক। আমি মনে করি, খুনি হচ্ছে অপরাধী। কারো আত্মীয় না। হোক সে কোন সন্তানের বাবা, কোন বোনের ভাই। কিন্তু খুনি খুনি-ই। খুনিকে খুনের শাস্তি দেওয়া হোক। সেটাই আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই।
বিভিন্ন আন্দোলনে মানুষ প্রাণ দিচ্ছে, আহত হচ্ছে কিন্তু আমরা দেখছি কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। কারণটা কি? আমাদের কি শিক্ষা নেওয়া উচিত ?
এসব প্রশ্নের জবাবে শহীদের এই মা বলেন, যারা অন্যায় করে না---- তারা দিতে জানে, নিতে জানে না। যেমন: আমি আমার এক সন্তানকে দিতে পেরেছি। আরও সন্তান দিতে প্রস্তুত। আমি নিজেও জীবন দিতে প্রস্তুত অন্যায়কে সমাজ থেকে নাই করার জন্য। আমি বলছি, আগের ফ্যাসিস্টদের মতো যদি আবার কেউ করে তাহলে আবার জুলাই নামবে। আরও কিছু মায়ের বুক খালি হবে। আরও কিছু মানুষ চোখ, হাত-পা হারাবে। এটা আমরা আর চাই না। আমাদের চাওয়া একটাই-- কেউ যেন ফ্যাসিস্ট না হয়। মানুষের সাথে বৈষম্যটা যেন আর না হয়। ফ্যাসিজম এবং বৈষম্য থেকে দূরে থাকতে হবে।
তিন বছরে তিন সরকারের আমলে তিন রকম উদযাপন দেখলাম। আগামী জুলাইটা কি রকম দেখতে চান শহীদের মা হিসেবে ?
জবাবে এই শহীদ জননী বলেন, আগামী জুলাইয়ে আমি যেন বলতে পারি যে এটা আমাদের সরকার, গণতান্ত্রিক সরকার। জুলাইয়ের সরকার। আমাদের সরকার খাদ্য, বস্ত্র. বাসস্থান সর্বোপরি স্বাস্থ্য সব কিছু সাধ্যের মধ্যে রেখেছে। খুন ছিনতাই রাহাজানি সবকিছু কমিয়ে ফেলেছে। মন খুলে যেন আপনাকে-ই কথাগুলো বলতে পারি।
১৮ বছর বয়সি শহীদ ফাহমিন জাফর ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। গাজীপুরের টঙ্গী সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়তেন তিনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা ফাহমিন জুলাই বিপ্লবে শহীদ হন। পরিবারের লোকজন জানালেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আন্দোলনের পক্ষে নিয়মিত লিখতেন তিনি। ১৮ জুলাই আন্দোলনে যাওয়ার আগে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ফাহমিন তার মাকে বলেছিলেন- আমি শহীদ হলে আমার লাশটা যেন গণভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তিনি ছাত্রদের দাবি আদায়ের পক্ষে উত্তরার আজমপুর এ বি সুপার মার্কেট এলাকায় যান। আন্দোলন অবস্থায় দুপুর সাড়ে ১২টায় ঘাতকের বুলেট কেড়ে নেয় তার প্রাণ। তার ওপর উপর্যুপরি গুলী করা হয়। ঝাঁঝরা হয়ে যায় পুরো দেহ। নিথর দেহটি অনেকক্ষণ পড়ে থাকে রাস্তায়। শহীদ হওয়ার সময় তার পরনে ছিল কলেজ ড্রেস। ঢাকার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে তার লাশ খুঁজে পায় পরিবার। তবে পরে পরিবারটিকে পোহাতে হয় নানা বিপত্তি। লাশ দাফনেও আসে বাধা। লাশ গোসল করাতে গেলে স্থানীয় মসজিদ কমিটি বাধা দেয়।
জুলাইয়ে আন্দোলন শুরু হওয়ার প্রথম থেকেই ছাত্রদের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখেন ফাহমিন। ছাত্রদের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও নিয়মিত স্ট্যাটাস দিতেন তিনি। ‘ফাহমিন নিয়মিতভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তেন। তাবলিগ জামাতে গিয়েছেন তিন বার।