ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যকার মহাপরিচালক পর্যায়ের চারদিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলন শেষ হয়েছে। তবে বৈঠক শেষে দুই বাহিনীর মহাপরিচালকরা প্রথা অনুযায়ী যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে অংশ নেননি, যা নজিরবিহীন। এদিকে গতকাল শুক্রবার বিজিবির পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা, চোরাচালান, অনুপ্রবেশ, অবৈধ অভিবাসন, সীমান্ত অবকাঠামো, পানি বণ্টনসহ বিস্তৃত ইস্যুতে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলনে ১১টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
গত ৮ থেকে ১১ জুন অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে উভয় দেশ পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার, আস্থা বৃদ্ধি এবং সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে। সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এবং ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর মহাপরিচালক শ্রী প্রবীন কুমার। দুই দেশের প্রতিনিধিদলে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, নৌপরিবহন, ভূমি জরিপ, যৌথ নদী কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক দপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন। সম্মেলনের শেষে উভয় পক্ষ আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হয়।
সম্মেলনে সবচেয়ে গুরুত্ব পায় সীমান্ত হত্যা ও সহিংসতা প্রতিরোধ। বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এসব ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি সীমান্ত এলাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়ন, যৌথ টহল বৃদ্ধি, নজরদারি জোরদার এবং অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। এর জবাবে উভয় পক্ষই সম্মত হয় যে, সীমান্তে হত্যা ও সহিংসতা প্রতিরোধে আন্তরিক, সমন্বিত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে হবে। যৌথ টহল বৃদ্ধি, তথ্য বিনিময় এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও একমত হয় দুই দেশ।
সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ ইস্যু নিয়ে আলোচনায় বিজিবি জানায়, রোহিঙ্গা ও অন্যান্য নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা দ্বিপাক্ষিক নির্দেশিকা ও বিদ্যমান প্রটোকলের পরিপন্থী। এসব ঘটনায় মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে এবং অনেকেই চরম দুর্দশার মধ্যে পড়ছে বলে বাংলাদেশ পক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ পক্ষ পুনর্ব্যক্ত করে যে, যাচাইকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুত গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক জাতীয়তা যাচাইকরণ ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান। দুই পক্ষই পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এসব বিষয় সমাধানের বিষয়ে সম্মত হয়। সীমান্ত দিয়ে মাদক, অস্ত্র ও অন্যান্য চোরাচালান বৃদ্ধি নিয়ে উভয় পক্ষই উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিজিবি মহাপরিচালক ভারত থেকে হেরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদক প্রবেশকে তরুণ সমাজের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ চোরাচালানও উদ্বেগজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিএসএফ পক্ষও মাদক, চোরাচালান ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানায়। উভয় পক্ষ সমন্বিত টহল, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি এবং ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ জোরদারের বিষয়ে একমত হয়। সীমান্ত বেড়া ও অবকাঠামো নির্মাণ নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিজিবি অভিযোগ করে যে আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অনুমোদন ছাড়া নিরাপত্তা বেড়া, বিদ্যুৎ লাইন, সিসিটিভি ক্যামেরা ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, যা পূর্বনির্ধারিত নিয়ম ও প্রটোকলের পরিপন্থী। জবাবে বিএসএফ জানায়, এসব অবকাঠামো মূলত স্থানীয় জনগণের সুবিধা ও নিরাপত্তার জন্য স্থাপন করা হয়। তবে উভয় পক্ষই সম্মত হয় যে ১৫০ গজ সীমার মধ্যে কোনো নির্মাণ কার্যক্রম চালানোর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে এবং বিদ্যমান নির্দেশিকা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। পানি বণ্টন ও সীমান্ত নদীর ব্যবহার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। বিজিবি মহাপরিচালক কুশিয়ারা নদী থেকে পানি উত্তোলন সংক্রান্ত সমঝোতা বাস্তবায়নে বিলম্বের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং কৃষি সেচ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি রহিমপুর খাল খননসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত অনুমোদনের আহ্বান জানান।
এছাড়া নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প, বিশেষ করে কুশিয়ারা ও কুলিক নদী এলাকায় দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়েও আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধানের বিষয়ে একমত হয়। সীমান্ত নির্ধারণ ও সীমান্ত পিলার স্থাপন নিয়েও অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। বিজিবি অনুপস্থিত সীমান্ত পিলার দ্রুত স্থাপন এবং নদীভিত্তিক সীমান্ত নির্ধারণ কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার ওপর জোর দেয়। উভয় পক্ষ যৌথ জরিপ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়। পার্বত্য ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়। বিজিবি ভারতের মিজোরামসহ পার্বত্য এলাকায় বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রম চালাতে পারে এমন গোষ্ঠীর বিষয়ে সতর্ক করে। জবাবে বিএসএফ জানায়, তাদের ভূখণ্ডে কোনো সন্ত্রাসী বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া হয় না এবং এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হয়। জাল মুদ্রা ও স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ে দুই দেশ তথ্য বিনিময় ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে সম্মত হয়। সীমান্তবর্তী চেকপোস্টে আধুনিক শনাক্তকরণ যন্ত্র স্থাপন ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
মানবপাচার, রোহিঙ্গা সংকট ও অবৈধ অভিবাসন নিয়েও আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ মানবপাচার প্রতিরোধ, উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার এবং ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুকে মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়। সীমান্ত সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে গুজব ও ভুয়া তথ্য প্রচার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। দুই দেশই একমত হয় যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সীমান্ত ঘটনার সঠিক তথ্য দ্রুত প্রকাশ করা হবে। সম্মেলন শেষে উভয় মহাপরিচালক বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।