নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : এক সময় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ত স্বর্ণের বার। যাত্রীবেশে আসা চোরাকারবারিরা লাগেজ, হ্যান্ডব্যাগ এমনকি শরীরের ভেতরেও স্বর্ণ বহন করত। নিয়মিত অভিযান ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রায়ই ধরা পড়ত কেজি কেজি স্বর্ণের চালান। কিন্তু গত এক বছরে দৃশ্যপট বদলেছে। এখন বিমানবন্দরজুড়ে চোরাচালানের সবচেয়ে বড় পণ্য হয়ে উঠেছে বিদেশী সিগারেট। এরপর রয়েছে নিষিদ্ধ কসমেটিকস এবং উচ্চ শুল্কের ইলেকট্রনিক পণ্য। বিমানবন্দর ও শুল্ক গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এই পরিবর্তন আকস্মিক নয়; বরং চোরাচালান চক্রের পরিকল্পিত কৌশলগত রূপান্তর।

স্বর্ণের জায়গা দখল করেছে সিগারেট : বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এক বছর আগেও স্বর্ণের বার ছিল চোরাচালানের প্রধান পণ্য। তবে এখন স্বর্ণ পাচারকারী চক্রের একটি বড় অংশ সিগারেট আমদানির দিকে ঝুঁকেছে।

কাস্টমস গোয়েন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারে ২০ টাকা মূল্যের একটি সিগারেটের শলাকায় প্রায় ১৭ টাকার মতো শুল্ক আরোপিত হয়। অর্থাৎ শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিপুল মুনাফা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। একটি ১০ প্যাকেটের কার্টন সিগারেটে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত লাভের সুযোগ থাকায় চোরাকারবারিদের কাছে এটি দ্রুত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

তাদের মতে, স্বর্ণ চোরাচালানের তুলনায় সিগারেট পাচারের আইনি ঝুঁকি কম এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে কম কঠোর হওয়ায় সিন্ডিকেটগুলো নতুন কৌশলে এই খাতে সক্রিয় হচ্ছে।

সাত রুটের পাঁচটিতেই সক্রিয় চোরাকারবারি : বর্তমানে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জেদ্দা, মক্কা-মদিনা, দোহা, দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি ও মাস্কাট-এই সাতটি আন্তর্জাতিক রুট পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এর মধ্যে অন্তত পাঁচটি রুট ব্যবহার করে নিয়মিত চোরাই সিগারেট আনার চেষ্টা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি নজরে এসেছে দুবাই থেকে আসা ফ্লাইটগুলো। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে এ প্রবণতা চললেও সম্প্রতি বিষয়টি স্পষ্টভাবে নজরে আসে। এরপরই বিশেষ নজরদারি শুরু করা হয়।

শুধু সিগারেট নয়, ১৭ ধরনের পণ্যের চোরাচালান : বিমানবন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তত ১৭ ধরনের পণ্য শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে-বিদেশী সিগারেট,নিষিদ্ধ কসমেটিকস, মোবাইল ফোন, ই-সিগারেট ও ভ্যাপ, মদ ও মদজাত দ্রব্য, ল্যাপটপ, ইলেকট্রনিক পণ্য, বিউটি ক্রিম, ফাস্ট এইড বক্স, সার্ভার, হুক্কা, পিসিবি, টেলিভিশনসহ অন্যান্য উচ্চ শুল্কের পণ্য। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি জব্দ হচ্ছে সিগারেট ও কসমেটিকস।

ছয় মাসে ২৫ হাজারের বেশি কার্টন সিগারেট জব্দ : সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়- ডিসেম্বর ২০২৫: ৬,৫৪৪ কার্টন সিগারেট ও ১,৬৪৯ পিস নিষিদ্ধ কসমেটিকস, জানুয়ারি: ১,৯৯৭ কার্টন ও ৫৮১ পিস, ফেব্রুয়ারি: ৪,৩৩৪ কার্টন ও ২,২১৪ পিস, মার্চ: ১,৪৫৬ কার্টন ও ৯৪০ পিস, এপ্রিল: ৪,১৯১ কার্টন ও ৮৬১ পিস এবং মে: ৫,৮৩৪ কার্টন ও ২,৭৫১ পিস। এই হিসাবে ছয় মাসে ২৫ হাজারেরও বেশি কার্টন সিগারেট আটক হয়েছে।

এটি কি কৌশলগত বিভ্রান্তি? : শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেশি সিগারেট ধরা পড়ছে মানেই যে স্বর্ণ বা মাদক আসা বন্ধ হয়েছে-এমন ধারণা সঠিক নাও হতে পারে। তার ভাষ্য, অতীতেও চোরাচালান চক্র পণ্যের ধরন বদলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর অন্যদিকে সরিয়ে নতুন চালান প্রবেশ করিয়েছে। কয়েক বছর আগে স্বর্ণের পরিবর্তে মাদক প্রবেশ বাড়লেও পরে আবার স্বর্ণে ফিরে যায়। এখন সিগারেটের প্রবণতাও একই ধরনের বিভ্রান্তিমূলক কৌশল হতে পারে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝুঁকিও বেড়েছে। অন্যদিকে সিগারেটের স্থানীয় চাহিদা বেশি, বাজারজাত করাও সহজ।

বিমানবন্দরের ভেতরেই সক্রিয় সিন্ডিকেট? : বিমানবন্দর সূত্রের দাবি, চোরাই পণ্য বাইরে নিতে কয়েকটি নির্দিষ্ট কৌশল ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ চক্র। অভিযোগ রয়েছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি এবং কিছু ঠিকাদার এ কাজে সহায়তা করে থাকে।

সূত্রের দাবি, বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা কয়েকটি দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অবাধ যাতায়াত সুবিধা কাজে লাগিয়ে পণ্য স্থানান্তরের চেষ্টা হয়। পার্কিং এলাকার দোকান এম এস-১, এম এস-২ ও শাহ আমানত স্ন্যাক্স কর্ণারের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন এই চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের দাবি উঠেছে। এ ছাড়া ঢাকাকেন্দ্রিক একটি চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

‘ লোকাল যাত্রী’ কৌশলে পণ্য সরানোর অভিযোগ : আরেকটি কৌশলের কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা বা ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম রুটে পরিচালিত হয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক যাত্রীবেশে আসা ব্যক্তি চট্টগ্রামে নেমে গেলেও হ্যান্ড লাগেজ রেখে যান। পরে স্থানীয় যাত্রী পরিচয়ে অন্য ব্যক্তি সেই লাগেজ নিয়ে অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল দিয়ে বের হয়ে যায়। হ্যান্ড লাগেজে সব সময় ট্যাগ না থাকায় গোপন তথ্য ছাড়া এ ধরনের চক্র শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

শতভাগ স্ক্যানিংয়ের পর পাল্টা চাপ? : শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী ইব্রাহীম খলিল জানান, গত কয়েক মাসে চোরাই সিগারেট ও নিষিদ্ধ কসমেটিকস আনার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় দুবাই থেকে আসা ফ্লাইটে দুই মাস ধরে শতভাগ স্ক্যানিং চালু করা হয়েছে। তার দাবি, এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য কাস্টমস হলে আটকা পড়ছে। একই সঙ্গে কিছু যাত্রী স্ক্যানিংজনিত অতিরিক্ত অপেক্ষাকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি আরও জানান, যেসব কর্মকর্তারা বেশি সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে চাপ তৈরির চেষ্টাও হচ্ছে। বিমানবন্দরের ভেতরে অভিযোগ ওঠা দোকানগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বৈধ চুক্তি নেই; আদালতের আদেশে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, ফলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া জটিল হয়ে পড়েছে।

‘সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে’ কর্তৃপক্ষ : শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আবদুল্লাহ আলমগীর বলেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিমানবন্দর দিয়ে শুল্ক ফাঁকি, অবৈধ পণ্য প্রবেশ ও মুদ্রা পাচার প্রতিরোধে কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে কাজ চলছে। তার ভাষ্য, যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও নজরদারিতে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে চোরাচালান বন্ধ হয়নি-বরং পণ্যের ধরণ ও পদ্ধতি বদলেছে। স্বর্ণের জায়গায় এখন সিগারেট এসেছে, তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে এটিকে শুধু রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ চোরাচালান চক্র সাধারণত একটি পণ্যের আড়ালে আরেকটি পণ্যের প্রবেশপথ তৈরি করে। ফলে নজরদারি শুধু জব্দ অভিযানে নয়, সিন্ডিকেট শনাক্ত ও রুটভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণেও বাড়ানোর দাবি উঠছে।