ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় প্রস্তাবিত বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন) অন্যত্র স্থানান্তরের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাদের দাবি, জনবসতিপূর্ণ ও শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হলে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, যান চলাচল এবং শিল্পখাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
শনিবার (২৫ জুলাই) টঙ্গী শিল্পাঞ্চলের ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রীন সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম মহাসড়ক। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন ও অসংখ্য মানুষ এ সড়ক ব্যবহার করেন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে বা সংলগ্ন এলাকায় বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণ করা হলে দুর্গন্ধ, পরিবেশ দূষণ এবং বর্জ্য পরিবহনকারী যানবাহনের কারণে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে মহাসড়কে যানজটের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাবে।
বক্তারা আরও বলেন, বর্জ্য থেকে নির্গত দুর্গন্ধ ও দূষিত বাতাসের কারণে কাশি, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এছাড়া শিল্পাঞ্চলের কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে, যা শিল্পোন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তারা বলেন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই ব্যবস্থাপনা এমন স্থানে বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে জনবসতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা এবং প্রধান সড়কের স্বাভাবিক পরিবেশ ও কার্যক্রম বিঘ্নিত না হয়। পরিকল্পিত ও পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা চেরাগ আলী এলাকায় প্রস্তাবিত বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, সড়ক নিরাপত্তা এবং শিল্পাঞ্চলের সার্বিক স্বার্থ বিবেচনায় কেন্দ্রটি জনবসতি ও শিল্পাঞ্চল থেকে নিরাপদ দূরত্বে, পরিবেশসম্মত ও উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তর করা উচিত।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত মেয়র প্রার্থী ড. হাফিজুর রহমান তার ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্ট্যাটাসে তিনি দাবি করেন, গাজীপুর মহানগরের চৌরাস্তা, ভোগড়া বাইপাস, চেরাগআলী ও স্টেশন রোডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মহাসড়কসংলগ্ন স্থানে সেকেন্ডারি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ অত্যন্ত অপরিকল্পিত। তার ভাষ্য, এসব স্থাপনা থেকে একদিকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াবে, অন্যদিকে বর্জ্যবাহী ভ্যান ও মিনি ট্রাক চলাচলের কারণে যানজট বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে সাধারণ পথচারী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা এবং আশপাশের বাসিন্দারা দুর্ভোগে পড়বেন।
তিনি আরও বলেন, সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এসব প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সফল উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে মহানগরের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি অবিলম্বে মহাসড়ক সংলগ্ন এসব বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র উপযুক্ত বিকল্প স্থানে স্থানান্তরের আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'গাজীপুর মহানগরের উন্নয়ন করতে না পারলে অন্তত এটিকে নষ্ট করবেন না।'
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরাও একই ধরনের দাবি জানিয়ে বলেন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেমন জরুরি, তেমনি সেই ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, সড়ক নিরাপত্তা এবং শিল্পাঞ্চলের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
তবে এ বিষয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোঃ সোহেল রানা বলেন, 'বিআরটি প্রকল্পের ফ্লাইওভারের নিচে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা খালি স্থানগুলো বিভিন্নভাবে অপব্যবহৃত হচ্ছিল। বিশেষ করে কিছু স্থানে মাদকসেবন, মাদক কারবারসহ নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ ছিল। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম বন্ধ করে স্থানগুলোকে জনস্বার্থে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে সিটি কর্পোরেশন পরিকল্পিতভাবে সেগুলো চিহ্নিত করেছে।'
তিনি বলেন, 'এসব স্থানে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশসম্মত পদ্ধতিতে অস্থায়ী সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্জ্য নির্ধারিত সময়ে দ্রুত সংগ্রহ ও অপসারণ করা হবে এবং দুর্গন্ধ বা পরিবেশ দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। এ প্রকল্পের ফলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না, বরং অব্যবহৃত স্থানগুলো সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আসবে এবং নগরীর আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।'