ইবরাহীম খলিল, গফরগাঁও ময়মনসিংহ থেকে ফিরে :
১৯৯২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে বিএনপির সিনিয়র নেতা ব্রিগেডিয়ার (অব.) আ স ম হান্নান শাহ গফরগাঁওয়ে নতুন থানা স্থাপনের স্থান নির্ধারণ করতে আসেন এবং প্রশাসনিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যবর্তীস্থানে পাগলাবাজারের পাশে থানা স্থাপনের মতামত দেন। এরপর সেখানেই বর্তমান পাগলা থানাভবন নির্মিত হয়। মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্ত এবং জনমত উপেক্ষা করে নিজের কেনা জমিতে উপজেলা কার্যালয় স্থাপন করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন ময়মনসিংহ-১০গফরগাঁও সংসদীয় আসনের এমপি আক্তারুজ্জামান বাচ্চু। এই ঘটনায় উপজেলাজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এমপির এহেন স্বার্থবাদী সিদ্ধান্তে উপজেলার বিভিন্নস্থানে বিক্ষোভ করেছেন সচেতন মানুষ এবং খোদ বিএনপির নেতাকর্মীরা।
এই সময়ে এসে গফরগাঁওয়ের এমপি আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর নির্বাচনের আগে দেওয়া একটি বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে নির্বাচনের আগে পাগলা সাহেব আলী একাডেমী ( হাইস্কুল) মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া ভাষণে পাগলা থানাকে উপজেলায় উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেখানে বলতে শোনায় যায়, আপনারা কি পাগলা থানার উন্নয়নে পাগলাকে উপজেলায় উন্নীত করতে চান? তাহলে ধানের শীষে ভোট দিন। সেই মাঠে কয়েক হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনের পরেও জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে পাগলা থানাকে উপজেলা বানানোর কথা বলেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন এমপি।
ঘটনার শুরু গফরগাঁও উপজেলার দক্ষিণাংশে স্থাপিত পাগলা থানাকে উপজেলায় রূপান্তরের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে। পাগলা থানাকে উপজেলায় উন্নীত করার দাবি অনেক দিনের। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে পাগলা থানাকে উপজেলায় রূপান্তরের জন্য ডিও লেটার দেন গফরগাঁও উপজেলার সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান। এতে পাগলা এলাকার মানুষ তাকে সাধুবাদ জানান এবং আনন্দ মিছিল করেন। কিন্তু কিছুদিন পর-ই এমপি আক্তারুজ্জামান বাচ্চু তার সিদ্ধান্ত বদল করেন। তিনি পাগলা থানা কিংবা উপজেলা শুনতে ভাল শোনায় না অযুহাতে নাম পরিবর্তন করে আরও একটি ডিও লেটার দেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। সেখানে তিনি উপজেলার নাম ‘আদর্শনগর’ প্রস্তাব করেন। যা একেবারেই অখ্যাত এবং ভৌগলিকভাবে গফরগাঁও উপজেলা এবং গফরগাঁও ইউনিয়নের পাশের ইউনিয়ন উস্তি ইউনিয়নের পাশে। এতে হতবাক হয়ে যায় সাধারণ মানুষ। কারণ আদর্শ নগর জায়গাটি কেউ চিনে না। পরে জানা যায়, তার কেনা জমিতে উপজেলা অফিস বানানোর জন্য গফরগাঁও উপজেলা এবং গফরগাঁও ইউনিয়নের একেবারে পাশের ইউনিয়ন উস্তি ইউনিয়নের নয়াবাড়ি গ্রামে একটি অখ্যাত জায়গা আদর্শনগরের নামে উপজেলা স্থাপনের প্রস্তাব দেন।
সরেজমিনে পরিদর্শনকালে স্থানীয় মসজিদের ঈমাম সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে জানিয়েছেন, এমপি আক্তারুজ্জামান বাচ্চু নয়াবাড়ীর গ্রামে বাসিন্দা রতনের কাছ থেকে জমি কিছুদিন আগে কিনেছেন। তিনি এখানে আরও জমি কিনবেন বলে শোনা যাচ্ছে। ফলে এমপি বাচ্চু এই জমিতে উপজেলা স্থাপনের জন্য মরিয়া। উপজেলার বিএনপির সিনিয়র নেতারা এমপির এহেন সিদ্ধান্তে হতবাক। তারা বলেছেন আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর এমন সিদ্ধান্ত পাগলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের সাথে প্রতারণার শামিল এবং প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ কারণ নির্বাচনের আগে তিনি পাগলায় কয়েকহাজার মানুষের সামনে সমাবেশে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার এই সিদ্ধান্ত মরহুম খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল।
এমপি বাচ্চুর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পাগলা থানার পাশে উপজেলা অফিস স্থাপনের দাবিতে পবিত্র আশুরার দিন শুক্রবার হাজার হাজার মানুষ মানবন্ধন এবং বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। গফরগাঁওয়ের বাসিন্দা ঢাকায় অবস্থানরত সরকারের একজন উধ্বর্তন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জানান, এমপির সিদ্ধান্ত ভৌগলিকভাবেও গ্রহণযোগ্য না। কারণ নয়াবাড়ী এলাকাটি বর্তমান গফরগাঁও উপজেলার গফরগাঁও ইউনিয়নের পাশে অবস্থিত। নতুন উপজেলার জন্য পাগলাথানার মধ্যবর্তী স্থান। পাগলা থানার পাশেই উপজেলা স্থাপন হবে উপযুক্ত স্থান। এমপি নিজের স্বার্থের জন্য ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সাবেক ছাত্র নেতা এম এ আলী বলেন, পাগলা থানার ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দত্তের বাজার ইউনিয়নের পাগলা বাজার সবচেয়ে কেন্দ্রীয় ও অধিকতর যৌক্তিক স্থান। পাগলা থানার একেবারে পাশেই অবস্থিত এই বাজারটি দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের প্রশাসনিক, শিক্ষা, বাণিজ্য ও জনসেবার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে রয়েছে বাজার, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মক্তব, ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, সাব-রেজিস্টার অফিসসহ অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাগলা থানার অধীন ৮টি ইউনিয়নের সঙ্গে এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ ও সুসংগঠিত। সব দিক বিবেচনায় পাগলা বাজার উপজেলা স্থাপনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও উপযুক্ত স্থান।
শুক্রবার সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে জানা যায় নিজের সিদ্ধান্ত বহাল রাখার জন্য এমপি বাচ্চু উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে দিয়ে নামকাওয়াস্তে শুনানী করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট প্রেরণ করেন। তাতে হতবাক এলাকার মানুষ। সেইসাথে পাগলা থানার কাছেই উপজেলা অফিস স্থাপনের দাবিতে মিছিল সমাবেশ করেন হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু শোনানির জন্য সেখানে কেউ যাননি।
এলাকার মানুষ বলছেন, পাগলা নামকে অনেকে বিকৃত করতে চান। কিন্তু এখানে অনেক আল্লাহর পাগল এবং ওলি আউলিয়ার পায়ের চিহ্ন পড়েছে। রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। এছাড়া প্রশাসনিকভাবে মধ্যস্থল হওয়ায় এখানেই উপজেলাস্থাপন উচিত। গফরগাঁও উপজেলা বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলছেন পুরো জনমত উপেক্ষা করে এমপি নিজের কেনাজমিতে উপজেলা অফিস বানাতেই দ্বিতীয় ডিও লেটার দিয়েছেন। এটা অগ্রহণযোগ্য।
গফরগাঁও উপজেলা বিএনপির সিনিয়র নেতা ফোরকান পাগলা থানার সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বলেন, ১৯৯২ সালে নিকার বৈঠকে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তে এবং স্থায়ীকমিটির সদস্য ্্ব্িরগেডিয়ার (অব.) হান্নান শাহর সরেজমিন রিপোর্টের ভিত্তিতে থানা স্থাপিত হয়েছে। এখান থেকে উপজেলা সরিয়ে নেওয়া হবে খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিশ^াসঘাতকতা। এমপি আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর ভুল সিদ্ধান্তের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান উপজেলার সচেতন মানুষ এবং বিএনপির সিনিয়র নেতারা। এজন্য এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি দরখাস্ত দেওয়া হয়েছে। তাতে সহ¯্রাধিক মানুষ পাগলা থানাকে উপজেলায় উন্নীত করার পক্ষে সাক্ষর দিয়েছেন।
এদিকে পাগলা থানার নামে এবং পাগলা থানার কাছে উপজেলা অফিস স্থাপনের দাবিতে দলমত নির্বিশেষে বিক্ষোভ এবং মিছিল করেছেন এলাকার বাসিন্দারা। তারা বলছেন প্রথমত তারা পাগলা নামে যেহেতু থানা রয়েছে; এই নামেই ্উপজেলা করা হউক। এবং তা থানার কাছাকাছি কোন স্থানে করা হউক। কারণ নির্বাচিত হওয়ার আগে এমপি পাগলা থানাকেই উপজেলায় উন্নিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সেকথা ভুলে গেছেন। অন্য দিকে আদর্শ নগর নামে কোন গ্রামের অস্তিত্ব ন্ইে। নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য সেখানে উপজেলা অফিস স্থাপন করা হলে তা জনভোগান্তির কারণ হবে। পাগলাতে উপজেলা করা হলে সব বাসিন্দাদের জন্য মধ্যস্থল হবে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ নির্বাচনের আগে পাগলাকে উপজেলায় উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে গিয়ে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলছেন আক্তারুজ্জামান বাচ্চু। প্রথমে পাগলা থানাকে উপজেলায় উন্নীত করার জন্য ডিও লেটার এবং পরবর্তীতে অন্যস্থানে উপজেলা স্থাপনের নিমিত্তে আবারো ডিও লেটার জনগণের সাথে প্রতারণা বলে আখ্যায়িত করেছেন এলাকাবাসী। খোদ ময়মনসিংহ জেলার শীর্ষ নেতারা এই সিদ্ধান্তকে ভালভাবে নেননি। ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক বর্তমান বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটর ট্রেজারার ডা. মোফাখখারুল ইসলাম রানা এমপি বাাচ্চুর উপজেলা স্থাপনের ডিও লেটার ডিও লেটার খেলায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।
লোক দেখানো গণশুনানী! : এদিকে জনদাবি পাগলা থেকে উপজেলা কার্যালয় নিজের কেনা জমিতে নেওয়ার জন্য লোক দেখানো গণশুনানী করে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন এমপি আক্তারুজ্জামান বাচ্চু। নিয়ম এবং রীতি অনুযায়ী উপজেলার মধ্যস্থল পাগলাতে গণশুনানী হওয়ার কথা থাকলেও পাগলাবাসী এব্যাপারে কিছু জানেই না। তারা বলছেন এমপি তার মতলব হাসিল করার জন্য অন্য কোথাও নিজের পক্ষের মানুষ দিয়ে শুনানীর ব্যবস্থা করে থাকতে পারেন। এর প্রমাণ পাওয়া গেল পাগলা থানায় ওসির রুমে বসে। ডিসির শুনানীর সময় উপস্থিত থাকলেও আলাপকালে প্রস্তাবিত উপজেলা স্থাপনের জায়গারি নাম বলতে পারেননি পাগলা থানার ওসি। অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, উপজেলা গঠন একটি প্রশাসনিক বিষয়। মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোথায় উপজেলা হলে জনগণের সুবিধা বেশি হবে, সেটিই বিবেচনা করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত স্বার্থে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সরকার নির্ধারিত নিয়মেই সবকিছু হবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে এলাকার প্রয়োজন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনগণের সুবিধা বিবেচনা করা হয়। কোনো ব্যক্তির ইচ্ছায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হয় না।