২০১৮ সাল থেকে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও এখনো একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠার ৮ বছরেও বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই স্থায়ী কোনো জনবল। যদিও প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী ২৩৯ জন জনবল নিয়োগ দিয়েছিলেন বিভিন্ন পদে। পরবর্তী উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন যোগদান করেই নিয়োককৃত অনেকেরই বেতনভাতা বন্ধ করে দেন। ফলে তৈরি হয় সংকট। সেই সংকটের অবসান না হওয়ায় থমকে আছে বিশ্ববিদ্যালয়টির অগ্রযাত্রা। জনবল সমস্যাকেই প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রার প্রধান অন্তরায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু তাই নয়, এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস ও অবকাঠামো।
তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার মোল্লারগাও মৌজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ হলেও প্রকল্পের কাজ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। নিয়োগ দেওয়া হয়নি কনসালট্যান্ট।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৮ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী নিয়োগ পান। তিনি যোগদান করে নবীন এই বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে গিয়ে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১৮ এর ১২ ধারার উপধারা (১০) ধারা মোতাবেক অ্যাডহক ভিত্তিতে ২৩৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেন। যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে নব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দাঁড় করিয়েছিলেন, সেই অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া ২৩৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্থায়ীকরণের লক্ষে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কোনো কোনো পদের লিখিত পরীক্ষা নিলেও ভাইভা নিতে পারেননি। আবার কোনো কোনো পদের পরীক্ষা পর্যন্ত নিতে পারেননি বিশ্বব্যাপি মহামারি কেভিড-১৯ আসার কারণে। যার কারণে তাঁর মেয়াদকালে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্থায়ী করতে পারেননি। ২০২১ সালের ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৩য় সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত নং-১ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অ্যাডহক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থায়ীকরণের পূর্ব পর্যন্ত অ্যাডহক নিয়োগ অব্যাহত রাখার অনুমোদন দেয়া হয়।
সেখানে বলা হয়েছে, যেসব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও এর অধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর বা দপ্তর এবং সংবিধিবদ্ধ, স্বায়ত্তশাসিত বা জাতীয়কৃত প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ক্যাটাগরির সরকারি চাকরিতে (বিসিএস ছাড়া) সরাসরি নিয়োগের লক্ষ্যে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারেনি, সেসব দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকাশিতব্য বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত পদে আবেদনের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের বয়স ২০২০ সালের ২৫ মে তারিখে সর্বোচ্চ বয়সসীমার মধ্যে থাকলে ওই প্রার্থীরা আবেদন করার সুযোগ পাবেন। তবে, বিসিএসের জন্য এ সার্কুলার প্রযোজ্য হবে না।
২০২৩ সালের পহেলা জানুয়ারি নিয়োগ পাওয়া দ্বিতীয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন যোগদান করে তাদের বেতন ভাতা বন্ধ করে দেন। তিনি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে পিআরএল ছুটিতে থাকা অবস্থায় সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি যোগদান করে বেতন ভাতা বন্ধ করে দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকটের শুরু। এরপর থেকেই এখনও বেতন ভাতা বন্ধ রয়েছে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া সব জনবলের। বয়স সংক্রান্ত বিষয়সহ নানা অজুহাতে তিনি বেতন ও স্থায়ী নিয়োগ বন্ধ রাখেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং ০৫.০০.০০০০.১৭০.১১.০১৭.২০-১৪৯ তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ প্রজ্ঞাপন মোতাবেক ২৩৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্থায়ী করণের লক্ষে দ্বিতীয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন ২০২৩ সালের ১৭ জুন আবার একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেন, যার স্মারক নং সিমেবি/রেজি/নিয়োগ/২০২৩/২৮৭/৯৬।
যদিও করোনা মহামারির কারণে তৎকালীন সরকার সরকারি নিয়োগের বয়সে ৩৬ মাসের ছাড় দেয়। অর্থাৎ ২০২০ সালের ৩১ মার্চ যাদের বয়স ৩০ বছর ছিল, তারা সরকারি চাকরিতে নিয়োগের আবেদনের জন্য তিন বছর অতিরিক্ত সময় পান। সরকারি এসব নির্দেশনা সত্ত্বেও দ্বিতীয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন নানা অজুহাতে স্থায়ী নিয়োগ দেননি। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু হলে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে তিনিও পদত্যাগ করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. মো. ইসমাইল পাটোয়ারী। তিনিও পূর্বসূরীর পথ ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা বন্ধ রাখেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর গত ২৭ এপ্রিল অধ্যাপক ডা. মো. ইসমাইল পাটোয়ারীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
একই দিনে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জিয়াউর রহমান চৌধুরীকে চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। তাঁকে নিয়ে ৮ বছরে চারজন উপাচার্য পেল সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে শুধু প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী পূর্ণ করতে পেরেছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় উপাচার্য তাদের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। চতুর্থ উপাচার্য গত ২৮ এপ্রিল থেকে দায়িত্বপালন করছেন। প্রথম উপাচার্য বিদায় নেওয়ার পর থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদে স্থিতিশীলতা দেখা যায়নি। ফলে ৮ বছর পেরিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম এখনো সীমিত। অবকাঠামোগত উন্নয়ন না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কার্যক্রমও শুরু করতে পারেনি। বর্তমানে শুধুমাত্র অধিভূক্ত মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস, বিডিএস ও নার্সিং কোর্সের পরীক্ষা নেওয়াতেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের।
জানা গেছে, ২৩৯ জনের মধ্যে ২০ জনের মতো জনবল ডেইলি বেসিসে এখনও কাজ করছেন। বাকিদের কাজের সুযোগ দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। তারা কাজের বাইরে রয়েছেন। বেতন ভাতা না পাওয়ায় বাকিরা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতন জীবনযাপন করছেন।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১৮ এর ১২ ধারার উপধারা (১০) অনুযায়ী তারা নিয়োগ পেয়েছেন। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত ৫ম সিন্ডিকেট সভায় অ্যাডহক ভিত্তিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির বৈধতাও দেওয়া হয়েছে। তবুও পূর্ববতী সময়ে ঠুনকো অজুহাতে তাদের বেতন ভাতা বন্ধ করা হয়েছে। এখানে নিয়োগ পাওয়া সবাই এই দেশেরই নাগরিক। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে বর্তমান উপাচার্য তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেবেন, সেই প্রত্যাশা করেন।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে স্থায়ীকরণ না করে তাদের বেতন ভাতা বন্ধ রেখে উল্টো সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজর ৪ জন শিক্ষককে বিভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তন্মেধ্যে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে রয়েছেন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজর বর্তমান অধ্যক্ষ, সহকারী রেজিস্টারের দায়িত্বে ডা. মো. ইশতিয়াক বখত, সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে ডা. ফয়ছল আহমদ, ডেন্টাল ইউনিটের ডা. সাইফুর রহমানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসারের দায়িত্বে ও সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শান্তানু দাসকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়ে নিয়োগ দেয়া হয়েছে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে (দায়িত্ব ভাতাসহ)। একজন সরকারি চাকরিজীবী কিভাবে একইসময়ে দুইটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জিয়াউর রহমান চৌধুরী বলেন, আমার প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প। জমি অধিগ্রহণ সম্পূর্ণ হয়েছে। এখন কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া হবে। তারপর ক্যাম্পাসের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। জনবল সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।