মুহাম্মদ নূরে আলম
আন্তর্জাতিক কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে একের পর এক ঐতিহাসিক অর্জনে বিশ্বকে চমকে দিচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আইরিন খানের অন্তর্ভুক্তি বর্তমান সরকারের ‘স্মার্ট ও দূরদর্শী’ কূটনীতির এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের গৌরবোজ্জ্বল নেতৃত্বের পর এবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকার, সুশাসন ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ আইরিন খান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই হাই-প্রোফাইল নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম স্বাক্ষরিত আধা-সরকারি পত্র (ডিও লেটার) অনুযায়ী, সরকারের প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ও বেতনে আগামী দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক এই বড় দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে তাকে। গতকাল বুধবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। বিশ্বমঞ্চের নীতিনির্ধারণী আসনে বাংলাদেশের এই দ্বৈত মেধার সহাবস্থান বৈশ্বিক কূটনীতিতে ঢাকার প্রভাবকে এক অভূতপূর্ব ও নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে বলে মনে করছেন জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সামরিক সংঘাত এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ প্রত্যাবাসন ঝুলে থাকা বাংলাদেশের জন্য বর্তমান ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ। আইরিন খান দীর্ঘকাল অ্যামনেস্টি এবং জাতিসংঘে কাজ করার সুবাদে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) আইনি প্রক্রিয়াসমূহ খুব ভালো বোঝেন। জাতিসংঘে তার উপস্থিতি মিয়ানমার জান্তা ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে এবং বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের পক্ষে ধরে রাখতে দারুণ ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া, বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য আসা মানবিক অনুদান বা তহবিল দিন দিন কমছে; আইরিন খানের ব্যক্তিগত ইমেজ জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থা থেকে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল নিশ্চিত করতে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। এছাড়াও জলবায়ু ক্ষতিপূরণ তহবিলসহ অন্যান্য তহবিল পেতে সহজ হবে। ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে থাকায় জলবায়ু অর্থায়ন, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক শাসন সংস্কারে বাংলাদেশ যে বিশ্বনেতৃত্ব দিচ্ছে, স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আইরিন খানের উপস্থিতি সেই প্রস্তাবগুলোকে দ্রুত পাস করিয়ে নিতে সাহায্য করবে। সভাপতির কার্যালয় এবং স্থায়ী মিশনের এই ‘ডাবল কম্বিনেশন’ আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে ঢাকাকে এক অপরাজেয় শক্তি দেবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এক ঐতিহাসিক যুগান্তকারী মুহূর্ত পার করছে। একদিকে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বিশ্বমঞ্চের পুরো অধিবেশন ও বৈশ্বিক এজেন্ডা সফলভাবে পরিচালনা করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। অন্যদিকে, জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বাংলাদেশের স্থায়ী নীতি ও জাতীয় স্বার্থের দরকষাকষিকে আরও ক্ষুরধার করতে সেখানে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আন্দোলনের কিংবদন্তি আইরিন খানকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহুপাক্ষিক ফোরামের শীর্ষ দুই পদে বাংলাদেশের এই দুই বিশ্বমানের ব্যক্তিত্বের সহাবস্থানকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে একটি বিরল ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আইরিন খানকে নিউ ইয়র্কের স্থায়ী মিশনে পাঠানোর দাপ্তরিক প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সচিব আসাদ আলম সিয়াম স্বাক্ষরিত ডিও লেটারে তার সুদীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আইনি প্রজ্ঞার উচ্চ মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই বিশেষ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার যে ব্যক্তিগত সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক স্বার্থে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বিশ্বমঞ্চে এক উজ্জ্বল নাম আইরিন খান: আইরিন খানের অ্যাকাডেমিক ও পেশাগত জীবন আন্তর্জাতিক আইন এবং বৈশ্বিক মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি বিশ্বখ্যাত ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ল’ স্কুল থেকে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি ও পা-িত্য অর্জন করেন। ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’-এর প্রথম মুসলিম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৪০ বছরেরও বেশি পুরনো এই প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থায় তিনিই ছিলেন প্রথম নারী, প্রথম এশীয় এবং প্রথম মুসলিম মহাসচিব। তার মেয়াদকালেই বিশ্বব্যাপী নারী ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষায় এবং পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে অ্যামনেস্টি সবচেয়ে বড় ও সফল বৈশ্বিক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি রোমভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেভলাপমেন্ট ল’ অর্গানাইজেশন’ (আইডিএলও)-এর প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা বিশ্বব্যাপী আইনের শাসন ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেন।
বর্তমানে তিনি জাতিসংঘের ‘মতপ্রকাশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ দূত’ হিসেবে অত্যন্ত স্বাধীন ও প্রভাবশালী দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত বিখ্যাত ‘গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’-এ অধ্যাপক হিসেবে আন্তর্জাতিক আইন পড়াচ্ছেন। মানবাধিকার ও বৈশ্বিক শান্তিতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৬ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘সিডনি পিস প্রাইজ’-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন।
জাতিসংঘের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের নীতিগত নেতৃত্বের সাথে আইরিন খানের আইনি প্রজ্ঞার মেলবন্ধন ঘটলে বাংলাদেশ বহুমুখী কৌশলগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করতে পারবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিকরা।
আন্তর্জাতিক ও জাতিসংঘ বিষয়ক কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, বিগত বছরগুলোতে অভ্যন্তরীণ নানা রাজনৈতিক সমীকরণ ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সমালোচনার কারণে বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কিছ তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। আইরিন খানের মতো একজন আন্তর্জাতিকভাবে সর্বজনস্বীকৃত মানবাধিকার চ্যাম্পিয়ন যখন জাতিসংঘের টেবিলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন, তখন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকবে না। এটি পশ্চিমা বিশ্বের (যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলাতে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও জিএসপি প্লাস সুবিধা আদায়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
সূত্রে জানা যায়, জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ সৈন্য প্রেরণকারী দেশ। তবে মাঝে মাঝে আন্তর্জাতিক লবিং বা অপপ্রচারকারীরা এই মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক তোলার চেষ্টা করে। আইরিন খানের উপস্থিতি এই ধরনের যেকোনো অপপ্রচার নস্যাৎ করতে এবং জাতিসংঘ সদর দপ্তরের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বাংলাদেশের সৈন্যদের অবদান ও পেশাদারিত্বকে নতুন আইনি সুরক্ষায় ভূষিত করতে পারবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, ড. খলিলুর রহমানের পর বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ আসনে আইরিন খানের এই পদচারণা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন আর বিশ্ব রাজনীতিতে কেবলই শ্রোতা নয়, বরং নীতি নির্ধারক। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর তার যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, তা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক কূটনীতিতে ঢাকাকে এক নতুন উচ্চতায় আসীন করবে। আইরিন খানের হাত ধরে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা নতুন এক মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে; এটাই এখন সময়ের জোরালো প্রত্যাশা।