জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড সৃষ্টিকারী জাতীয় বাজেট গতকাল বৃহস্পতিবার উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এটিই প্রথম বাজেট। একই সময়ে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ২০২৬-২৭’ জাতির সামনে পেশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
বড় ঘাটতি, বিশাল ব্যয় এবং রাজস্ব বৃদ্ধির তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে সরকারের ঘোষিত বাজেট এবং জামায়াতে ইসলামীর ইনসাফভিত্তিক ও কল্যাণমুখী বিকল্প বাজেটের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
বাজেটের আকার, আয় ও ব্যয় প্রাক্কলন
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট থেকে ১৮.৭৩% বৃদ্ধি করে সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করছে।
এর বিপরীতে, জামায়াতে ইসলামী দেশের সীমিত সামর্থ্য এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট বিবেচনা করে কিছুটা রক্ষণশীল ও বাস্তবসম্মত ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার বিকল্প বাজেটের প্রস্তাব করেছে।
ঘাটতি অর্থায়ন: ব্যাংক ঋণের চাপ বনাম টেকসই কৌশল
সরকারের বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি পূরণে বরাবরের মতোই অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাতের ওপর বড় নির্ভরতা রাখা হয়েছে। সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা এবং উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের এই অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দেবে এবং বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী তাদের বিকল্প বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ৫২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা কমিয়ে এনে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকায় সীমিত রাখার প্রস্তাব করেছে। এই ঘাটতি অর্থায়নে তারা ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর চাপ না কমিয়ে বৈদেশিক উৎস থেকে ৬৭ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ০১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা সংস্থানের কথা বলেছে। জামায়াতের মূল দর্শন হলো, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ কমলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যা অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সাহায্য করবে।
রাজস্ব নীতি ও কর ব্যবস্থা: জবরদস্তি বনাম করজাল সম্প্রসারণ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ১ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড ঘাটতির মধ্যেও সরকার আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এজন্য সরকার ভ্যাটের আওতা ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করে ছোট দোকানদারদের ওপরও বছরে ১ হাজার টাকা করে ভ্যাট চাপানোর পরিকল্পনা করেছে।
এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী করের হার না বাড়িয়ে এনবিআর ও দুদকের সংস্কার, পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন এবং করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে (যা জিডিপির ৯.৬৩%)।
করমুক্ত আয়সীমা ও কর কাঠামো
সরকার: সাধারণ নাগরিকদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা অন্তর্বর্তী সরকারের দেখানো পথেই ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ধার্য করছে। তবে নারী ও ৬৫ ঊর্ধ্বদের জন্য ৪ লাখ ২৫ হাজার, প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫ লাখ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ জন্য ৫ লাখ ২৫... হাজার টাকা করমুক্ত সীমা প্রস্তাব করা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী: জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চরম সংকটে থাকা সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষকে সুরক্ষা দিতে করমুক্ত আয়সীমা সরাসরি ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করেছে। এছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে সর্বনিম্ন করহার ৫% রাখার পক্ষে তারা মত দিয়েছে। তারা ঢালাও কর রেয়াত সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে হারানো রাজস্বের ৫০% পুনরুদ্ধারের প্রস্তাব করেছে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দ ও কৌশলগত রূপান্তর শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত
সরকার: অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের কথা বলেছে।
জামায়াতে ইসলামী: শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৮১%) বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে। তাদের শিক্ষা দর্শনে রয়েছেÑস্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন, মাধ্যমিকের সহকারী শিক্ষকদের বেতন ৯ম গ্রেডে উন্নীতকরণ, প্রতি ২ ইউনিয়নে একটি করে আলিয়া মাদরাসা সরকারি করা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য ‘শিক্ষা সহায়তা তহবিল’ গঠন করে মাসিক ৩,০০০ টাকা অনুদান ও উচ্চশিক্ষায় ১ লাখ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত ‘কর্জে হাসানা’ প্রদান। এছাড়া পোষ্যদের টিউশন ফির ওপর সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত কর রেয়াতের অভিনব প্রস্তাব করেছে দলটি।
স্বাস্থ্য খাত
সরকার: ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালু এবং কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানোর ঘোষণা দিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী: স্বাস্থ্য খাতে ৪৫ হাজার ২৪০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবসহ ৫ বছরের নিচে এবং ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে সব নাগরিকের জন্য সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে। প্রতিটি জেলা হাসপাতালকে টারশিয়ারি হাসপাতালে রূপান্তর এবং ৪টি সরকারি ও ৪টি পিপিপি মডেলে মোট ৮টি বিশ্বমানের বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে দলটি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
সরকার: আমদানিকৃত এলএনজি ও জ্বালানি নির্ভরতা বহাল রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ।
জামায়াতে ইসলামী: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে। বিগত সরকারের আমলের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’-এর লুণ্ঠনমূলক চুক্তি বাতিল, বাপেক্সের মাধ্যমে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন মোট চাহিদার ১০%-এ উন্নীত করার জন্য সোলার প্যানেলের ওপর কর ছাড়ের প্রস্তাব করেছে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান
সরকার: ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ কিছু নতুন কর্মসূচি চালুর কথা বলেছে এবং যুবসমাজের জন্য ৩০০ কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছে।
জামায়াতে ইসলামী: বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার (বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও মা-শিশু সহায়তা) হার মাসিক ৬৫০-৯০০ টাকা থেকে একলাফে বৃদ্ধি করে ১,০০০ টাকায় এবং পর্যায়ক্রমে ৩,০০০ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য একটি স্বতন্ত্র ‘দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়’ গঠন এবং দালালমুক্ত উপায়ে বিদেশে কর্মী পাঠিয়ে অভিবাসন ব্যয় হ্রাসের রূপরেখা দিয়েছে।
সুশাসন ও প্রশাসনিক সংস্কার
জামায়াতে ইসলামীর বিকল্প বাজেটের মূল ভিত্তিই হলো দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন। জামায়াতের মতে, সরকারি ক্রয়ে ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না আনলে এবং এনবিআর-এর কর্মকর্তাদের বিচার বিভাগ ও র্যাবের আদলে ‘ঝুঁকি ভাতা’ দিয়ে দুর্নীতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে না আনলে কোনো বাজেটই সফল হবে না। এছাড়া তারা সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের আগামী ১ জুলাই থেকেই ১০০% বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর করার সাহসী প্রস্তাব করেছে।
সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটটি যেখানে বিশাল ব্যয় ও ঘাটতির এক উচ্চাভিলাষী রূপরেখা, যা বাস্তবায়নে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অপরদিকে, জামায়াতে ইসলামীর বিকল্প বাজেটটি কেবল সংখ্যার সমাহার নয়; এটি করদাতার ওপর চাপ না বাড়িয়ে করের জাল বিস্তৃত করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তর করার ইনসাফভিত্তিক বাস্তবমুখী দলিল। বড় ঘাটতির এই বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ সরকার কীভাবে মোকাবেলা করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।