বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেছেন, গণভোটে প্রায় ৭০% মানুষের দেওয়া রায় বা মতামতকে উপেক্ষা করা বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক ভুল।

বুধবার (০১ জুলাই) বিকেলে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স (মুক্তিযোদ্ধা হলরুমে) অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখার সময় তিনি এই মন্তব্য করেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো কর্মসূচি ঘোষণা না করায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জুলাইয়ের ভয়াল দিন গুলোতে আওয়ামী লীগ কর্তৃক পরিচালিত নৃশংস গণহত্যা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতে তুলে না ধরলে জনগণ বিটিভির অভিমুখে ছুটতে পারে।

নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ হয়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় দেশ এগিয়ে যাবে এবং একটি জনকল্যাণকর রাষ্ট্র গঠিত হবে। কিন্তু সরকার জুলাই সনদ পাশ কাটিয়ে পুরোনো ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করেছে। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছে সেই শহীদ পরিবারকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে হবে। আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন করতে হবে। এবং সম্মানজনক ভাতা দিতে হবে।

জুলাই ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কারণে সরকার প্রধান নির্বাসিত জীবন থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছেন, রাজনীতি করতে পারছেন সেই জুলাইকে সরকার অস্বীকার করে জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে।

তিনি আরও বলেন, গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনমতকে পদদলিত করার দুঃসাহস দেখিয়ে বিএনপি বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে গভীর গর্তে বা সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ও 'জুলাই সনদ' পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করলে বিএনপিকে ভবিষ্যতে বড় ধরনের রাজনৈতিক খেসারত দিতে হতে পারে।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা একসময় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে বর্গা দেওয়া হয়েছিল। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেই হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা পুনরায় পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জুলাই সনদ ও জনমত উপেক্ষা করে দেশের স্বাধীনতাকে যদি আবারও ভিনদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।

নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে যদি কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা না হয়, তবে জামায়াতে ইসলামী দেশের সর্বস্তরের জনগণকে সাথে নিয়ে রাজপথে ঐক্যবদ্ধভাবে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবে।

কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি'র পরিচালনায় সভায় শহীদ শেখ মেহেদী হাসান জুনায়েদের পিতা শেখ জামাল হাসান বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদেরকে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিতে উৎসাহিত করেছিলেন। ওনার উৎসাহে আমরা গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়েছি। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠন করে গণভোটের রায় মেনে নেয়নি। গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সরকার জুলাই চেতনাকে অস্বীকার করছে এবং শহীদ ও আহতদের সাথে বেঈমানী করছে। শহীদ পরিবার, আহত-পঙ্গুত্ব বরণকারী জুলাই যোদ্ধারা, গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, গণহত্যার বিচার এবং রাষ্ট্র সংস্কার নিশ্চিত করা না হলে আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য।

শহীদ জিহাদ হোসেনের পিতা মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, চাঁদার জন্য তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা বারবার তালা মারার চেষ্টা করছে! তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমার সন্তান জীবন দিয়েছে বৈষম্যহীন, মানবিক ও ন্যায় বিচারের এক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের জন্য কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশ সেই পুরোনো ধারায় চলছে। যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

শহীদ ফারহান ফাইয়াজের পিতা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে যারা আছেন তারা অনেক সময় প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক তথ্য দেন না। অতীতেও পতিত শেখ হাসিনাকে ভুল তথ্য দিয়ে বিরোধী দলমতকে দমনে উৎসাহিত করা হতো। এখনও প্রধানমন্ত্রী ভুল তথ্য দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীকে বলা হচ্ছে আমরা (জুলাই পরিবার) বিরোধী দলের। কিন্তু ‘না’ আমরা কোনো দলের নয়। আমরা ন্যায় ও সত্যের পক্ষে। তবে জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত একমাত্র জামায়াতে ইসলামী আমাদের খোঁজ-খবর নিয়ে আসছে। অন্য কোনো দল কিংবা রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করেনি।

শহীদ পরিবার ও আহত-পঙ্গুত্ব বরণকারীদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন শহীদ রেজাউল করিমের পিতা আল-আমীন মীর, শহীদ আলিফের পিতা সৈয়দ গাজীউর রহমান, জুলাই যোদ্ধা আহত শাহ আলম গাজী, জুলাই যোদ্ধা আহত কামরুল ইসলাম। তাঁরা, জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ কর্তৃক পরিচালিত গণহত্যার বিচার সম্পন্ন করতে এবং গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে সরকারের কাছে দাবি জানান।

সভায় আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকির, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এমপি, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান এবং মো. শামছুর রহমান, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি আব্দুস সালাম, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক শাহীন আহমেদ খান প্রমুখ। নেতৃবৃন্দ, জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত-পঙ্গুত্ব বরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের দাবির পক্ষে একমত প্রকাশ করে বলেন, যেই বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। ফ্যাসিবাদের বিতাড়িত হয়েছে সেই জুলাই বিপ্লবের চেতনায় নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতেই হবে। কোনভাবে জুলাই সনদ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সরকার গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে। যেভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মানতে বিএনপি সরকার বাধ্য হয়েছে একইভাবে জুলাই সনদ মানতেও বাধ্য হবে। নেতৃবৃন্দ, জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত-পঙ্গুত্ব বরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে বলেন, জামায়াতে ইসলামী জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত-পঙ্গুত্ব বরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে।

অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য যথাক্রমে অধ্যাপক নুর নবী মানিক, শেখ শরীফ উদ্দিন আহমদ, ড. মোবারক হোসাইন, কামরুল আহসান হাসান, মাওলানা শরিফুল ইসলাম, মহানগরীর সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন, সহকারী মিডিয়া সম্পাদক আশরাফুল আলম ইমন, সহকারী অফিস সম্পাদক মো. মুজিবুর রহমান সহ মহানগরীর বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও জুলা্ই শহীদ পরিবার ও আহত-পঙ্গুত্ব বরণকারী জুলাই যোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন।