শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ও অন্যান্য দাবি পূরণ হওয়ায় আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। গতকাল শনিবার সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিজেপির প্রতিনিধিরা বৈঠক করেন। এরপর যৌথ ঘোষণায় তারা আন্দোলন সমাপ্তির ঘোষণা দেন এবং বিক্ষোভকারীদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। এনডিটিভি, এক্স, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, রয়টার্স, ইকোনোমিক্স টাইমস।
সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা ভারতের দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলন করেন। তারা সাংবাদিকদের বলেন, সরকার তাদের দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রতি দিয়েছে। আর সেই থেকে স্বদিচ্ছার অংশ হিসেবে তারা আন্দোলন সমাপ্ত করছেন।
তারা বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিটি তারা সরাসরি আদায় করে নিয়েছেন। আর দুটি দাবির মধ্যে ছিল বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে হওয়া পুলিশি অভিযোগ প্রত্যাহার ও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জেরে যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন তাদের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। সরকার তাদের এ দাবিগুলোও মেনে নিয়েছে।
মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেছেন, “সরকার যেহেতু আমাদের দাবি মেনে নিয়েছে তাই আমরা সব আন্দোলনকারীকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”
আরেক মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেছেন, “৩৬ দিনের আন্দোলনের পর সরকার আমাদের দাবি মেনে নিয়েছে। আমরা সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভস্থল থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের দাবিগুলো উগ্র ছিল না, ছিল সাধারণ এবং সরকার এখন এগুলো মেনে নিয়েছে।”
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, দিলীøর যন্তর মন্তরে পুলিশ লাউড স্পিকারে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিচ্ছে সরকার তাদের দাবি মেনে নিয়েছে এখন তারা যেন এখান থেকে সরে যান।
এক মাসের বেশি সময় ধরে তীব্র এ আন্দোলনের কারণে যন্তর মন্তরের আশপাশের মার্কেট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে আছে। এছাড়া জনাসমাগম আটকাতে সেখানকার ১৬-১৭টি মেট্রোস্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছিল।
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান অবশেষে পদত্যাগ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। গতকাল শনিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।এতে বলা হয়েছে, ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং কেন্দ্রের মধ্যে তৃতীয় দফা বৈঠকের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ ঘোষণা দেন।
মোদির জেদের পরাজয়ে উচ্ছ্বসিত বিরোধীরা
শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম ও নিট কেলেঙ্কারির অভিযোগে দেশজুড়ে চলা আন্দোলনের মুখে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক বিজয় হিসেবে দেখছে দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। আম আদমি পার্টি আপ এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসসহ প্রধান বিরোধী দলগুলোর দাবি, আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও তরুণদের দীর্ঘ লড়াইয়ের ফলেই এই পদত্যাগ।
আম আদমি পার্টির আহ্বায়ক ও দিলীøর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় আন্দোলনকারী তরুণদের অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের তরুণ সমাজ ও জেন জিকে আন্তরিক অভিনন্দন। আপনাদের নিরলস লড়াইয়ের ফলেই ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এত বড় আন্দোলনের পর অবশেষে জনগণের কণ্ঠস্বরের সামনে সরকারের অহংকার চূর্ণ হলো। এটি ভারতীয় গণতন্ত্রের এক বিরাট জয়।’ কংগ্রেস সভাপতি ও রাজ্যসভার বিরোধীদলীয় নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে এই পদত্যাগকে ভারতের লাখো তরুণের রাজপথের লড়াইয়ের জয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ভারতের শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত চিৎকার অবশেষে অহংকারী ক্ষমতার চৌকাঠে গিয়ে পৌঁছেছে। এটি রাজপথে নেমে লড়াই করা কোটি কোটি যুবকের জয়, সত্যের জয় এবং নরেন্দ্র মোদির একগুঁয়েমির পরাজয়। দুর্নীতির কারণে যেসব পরিবার তাদের সন্তানদের হারিয়েছে, এটি তাদেরও জয়। একই সঙ্গে সংসদ থেকে রাজপথ পর্যন্ত প্রতিবাদ গড়ে তোলা ঐক্যবদ্ধ বিরোধী শিবিরেরও জয়।’ খাড়গে আরও দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উচিত দেশের তরুণদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া। পাশাপাশি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ ও পেলেট গান ব্যবহারের জন্য দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে আসামের মন্ত্রীর মেয়ের
অংশগ্রহণে অস্বস্তি
আসামের রাজ্য রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন আলোচনার কেন্দ্রে রাজস্ব মন্ত্রী কেশব মহন্তের মেয়ে দিবিসা মহন্ত। গুয়াহাটির চাচালে আয়োজিত শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিবাদ বিক্ষোভে যোগ দিয়ে তিনি কেন্দ্র ও বিজেপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন, যা রাজ্য সরকার তথা ক্ষমতাসীন জোটের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি’-র বিতর্কিত প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নানা অনিয়মের অভিযোগে এই বিক্ষোভের আয়োজন করে শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভকারীরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দিবিসা মহন্ত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন। এ সময় তাকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধেও সরাসরি স্লোগান তুলতে দেখা যায়।
দিবিসা মহন্তের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তার বাবা কেশব মহন্ত আসামের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ‘অসম গণ পরিষদ’ (এজিপি)-এর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা। এজিপি বর্তমানে আসামে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অন্যতম শরিক দল।
বর্তমান রাজ্য পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘একই সঙ্গে আসাম এখন বন্যার কারণে একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, তাই আমি সবাইকে অনুরোধ করব যেন এই মুহূর্তে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার দিকেই সবার নজর থাকে।’ প্রতিবাদ সমাবেশটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। চাচালের নির্ধারিত স্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার ছিল এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সুর চড়ানো নিয়ে আসামের রাজনীতিতে তোলপাড় অব্যাহত রয়েছে।