মুহাম্মদ কামাল হোসেন
বিকেলের আকাশটা আজ বড্ড নিচু হয়ে আছে। ছাইরঙা মেঘেরা স্টেশনের জং ধরা টিনের চাল ছুঁয়ে দিতে চায়। মনসুর আহমেদ তার তিনতলা বাড়ির ছাদে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। বাতাসের ঝাপটায় তার সাদা দাড়িগুলো অবাধ্য হয়ে ওড়ে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। চশমার কাঁচটা বারবার ঝাপসা হয়ে আসে। তিনি তর্জনি দিয়ে আলতো করে তা মোছেন। এটা তার প্রাত্যহিক দস্তুর। এই স্টেশন। এই লোহার রেললাইন। এক যুগ ধরে মনসুর আহমেদের একমাত্র পাঠ্যবই। এর বাইরে তার আর কোনো জগৎ নেই।
নিচে তখন ঢাকাগামী লোকাল ট্রেনটা এসে দাঁড়িয়েছে। ইঞ্জিনের গরম ভাপ আর চাকার ঘর্ষণে চারপাশটা মুখর। মনসুর আহমেদের বুকটা ধক করে ওঠে। প্রতিবার ট্রেন থামলে তার হৃদস্পন্দন থমকে যায়। তিনি ঝুঁকে পড়েন রেলিংয়ের ওপর। কামরা থেকে মানুষ নামছে। পিলপিল করে বেরোচ্ছে অগণিত ছায়া। কেউ মাথায় চটের বস্তা নিয়েছে। কেউ কোলের শিশুকে শক্ত করে চেপে ধরেছে। কারো হাতে বাজারের প্লাস্টিক ব্যাগ। মনসুর আহমেদ খুঁজছেন তার আরিয়ানকে। বারো বছর আগে চৌদ্দ বছরের যে কিশোরটি ঘর ছেড়েছিল, সে কি এখন জোয়ান মরদ? তার কাঁধ দুটো কি চওড়া হয়েছে? চিবুকে কি দাড়ি গজিয়েছে? মনসুর আহমেদ মনে মনে আরিয়ানের একটা অবয়ব আঁকেন। প্রতিদিন সেই অবয়ব বদলায়। কখনো সে সুফি যুবক। কখনো শার্ট প্যান্ট পরা শহুরে বাবু। কিন্তু কোনো চেহারার সাথেই ভিড়ের মানুষগুলোর মিল মেলে না। বিকেলের ম্লান আলোয় মানুষগুলোকে চেনা যায় না। শুধু চলমান কিছু অবয়ব চোখে পড়ে। মনসুর আহমেদ ভাবেন, সময় কি মানুষের চেহারা এতটা বদলে দেয়, জন্মদাতা পিতাও তাকে চিনতে পারবে না? এই অগণিত মানুষের ভিড়ে কি তার নিজের রক্তবিন্দু হারিয়ে গেল?
সাবরিনা বেগম নিচে বারান্দায় বসে তসবিহ গুনছেন। তার চোখের জ্যোতি এখন ক্ষীণ। ছানি পড়া চোখে তিনি স্পষ্ট কিছু দেখেন না। কিন্তু তার কান দুটো খুব সজাগ। ট্রেনের হুইসেল বাজলেই তিনি অস্ফুট স্বরে বলেন, সুবহানাল্লাহ। তিনি জানেন তার বুড়ো কর্তা এখন ছাদে। তিনি জানেন মনসুর আহমেদ এখন এক মনে আরিয়ানকে খুঁজছেন। এক যুগ ধরে এই প্রতীক্ষা তাদের জীবনের সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবরিনা বেগমের মনে পড়ে সেই অভিশপ্ত দুপুরের কথা। খুব সামান্য এক কথা কাটাকাটি। আরিয়ান চেয়েছিল ফুটবল কিনতে। মনসুর আহমেদের হাতে তখন পয়সা কম। তিতাস গ্যাস বিল আর বাজারের ফর্দে কাটাকুটি করতে করতে মেজাজ বিগড়ে ছিল তার। জেদি ছেলেটা যখন বারবার টাকা চাইল, মনসুর আহমেদ আর সামলাতে পারেননি। আরিয়ানের গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ বসে গিয়েছিল। ছেলেটা সেদিন কাঁদেনি। শুধু তড়তড় করে এক গ্লাস পানি খেয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। সাবরিনা বেগম আজও সেই গ্লাসটা ধোননি। আলমারিতে তুলে রেখেছেন। ওতে আরিয়ানের ওষ্ঠের শেষ শীতলতা লেগে আছে বলে তার বিশ্বাস। মায়েরা বোধহয় এমনই হয়। জিনিসের ভেতরেও তারা হারানো মানুষের স্পর্শ খুঁজে পায়।
মনসুর আহমেদ বাড়ির এই জায়গাটি বেছেছিলেন অনেক ভেবে। স্টেশনের গা ঘেঁষে এমন তিন তলা দালান কেউ সচরাচর করে না। ট্রেনের শব্দে ঘুমানো দায়। পাথরের গুঁড়ো আর ধোঁয়ায় ঘরবাড়ি নোংরা হয়। কিন্তু মনসুর আহমেদ চেয়েছিলেন তার চোখের সামনে যেন রাস্তাটা থাকে। ট্রেনের প্রতিটি যাত্রী তার দৃষ্টিসীমার ভেতর দিয়ে যায়। ছাদটা করেছেন খোলামেলা। যাতে দূরের সিগন্যাল বাতিও দেখা যায়। সিগন্যাল লাল হলে ট্রেন থামে। সেই লাল আলোয় মনসুর আহমেদ নিজের রক্তের টানকে খুঁজতেন। তিনি জানতেন, আরিয়ান একদিন এই পথেই ফিরবে। কারণ অভিমানের পথ যতই দীর্ঘ হোক, তা শেষ হয় চেনা দুয়ারে আসেই। মানুষ তো আসলে পরিযায়ী পাখি। দিনশেষে সবাই নিজের নীড়েই ফিরতে চায়।
আজ তার সেই সাধের বাড়ি হয়েছে। কিন্তু সেই বাড়িতে আরিয়ানের পায়ের শব্দ নেই। মাগরিবের আজান দিচ্ছে স্টেশনের পাশের ছোট মসজিদ থেকে। মনসুর আহমেদ ছাদ থেকে নামলেন না। তিনি সেখানেই জায়নামাজ বিছিয়ে দিলেন। বাতাসে জায়নামাজের কোণা উড়ছে। তিনি সিজদায় গিয়ে অনেকক্ষণ পড়ে থাকলেন। আল্লাহর কাছে চাইলেন তার কলিজার টুকরোকে। মোনাজাত শেষে উঠে বসলেন। আকাশের মেঘগুলো আরও কালো হয়েছে। স্টেশনের বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। হলদেটে আলোয় প্ল্যাটফর্মটাকে কেমন অপার্থিব লাগছে। কুয়াশা না থাকলেও আজ চারপাশটা কেমন ঝাপসা। যেন স্মৃতির ধুলো জমেছে সবখানে। ট্রেনের হুইসেলটা বাতাসের গায়ে হাহাকারের মতো আছড়ে পড়ছে।
অবিনাশ বাবু তখন ওষুধের দোকান বন্ধ করে লণ্ঠন হাতে ফিরছিলেন। মনসুর আহমেদকে ছাদে দেখে তিনি নিচ থেকে ডাক দিলেন। মনসুর ভাই, ও মনসুর ভাই। নিচে নেমে এসো। চা খেয়ে যাই। মনসুর আহমেদ রেলিং দিয়ে মাথা বাড়ালেন। তার গলায় জড়তা। অবিনাশ, তুমি যাও। শরীরটা আজ জুত লাগছে না।
অবিনাশ বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি মনসুর আহমেদের ছোটবেলার বন্ধু। আরিয়ানকে নিজের ছেলের মতো ভালোবাসতেন। অবিনাশ লণ্ঠনের আলোয় ওপরের দিকে তাকালেন। মনে পড়ল দেশভাগের সময় তার বাবাও এমন এক স্টেশনে দাঁড়িয়ে নিজের ভিটেমাটির মায়া ছেড়েছিলেন। তিনি বুঝলেন মনসুর আহমেদ আসলে বাড়ি বানাননি, এক বিশাল বাতিঘর বানিয়েছেন। যে আলোয় পথ চিনে একদিন কেউ ফিরবে। অবিনাশ নিচু স্বরে বললেন, খবর পাঠালে তো মেঘেরাও পাঠায়। তুমি কেন শুধু ট্রেনের দিকে তাকিয়ে থাকো? মেঘেদের ওপর ভরসা রাখো। ওরা তো সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। ওদের চোখে সব দেখা যায়। মানুষের চোখের জল ওরা বাষ্প করে আকাশে নিয়ে যায়। আবার সেই জলই কারো উঠোনে ঝরিয়ে দেয়।
মনসুর আহমেদ হাসলেন। সেই হাসিতে শব্দ নেই। শুধু ঠোঁটের কোণায় এক করুণ রেখা। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, আমি জানি অবিনাশ। এই যে আকাশে মেঘ দেখছো, এরা আসলে একেকজন পিয়ন। মহান আল্লাহ এদের পাঠিয়েছেন মানুষের খবর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে। এরা যখন পুব থেকে পশ্চিমে যায়, আমি এদের কাছে আরিয়ানের নাম ধরে ডাকি। আমার মনে হয় আমার গলার স্বর-আর্তনাদ ওরা বয়ে নিয়ে যায় বহুদূরে। কোনো এক অচিন নগরে আরিয়ান হয়তো এখন বৃষ্টিতে ভিজছে। আর সেই বৃষ্টির ফোঁটার সাথে আমার ঘ্রাণ মিশে আছে। মেঘেরা তো কারো আপন নয়। তারা কেবল বয়ে যাওয়ার বার্তা জানে।
রাত বাড়ছে। স্টেশনে এখন লোক কম। একটা মালবাহী ট্রেন ধীর গতিতে চলে গেল। লোহায় লোহায় ঘর্ষণের কর্কশ শব্দ নির্জন রাতকে চিরে ফেলছে। মনসুর আহমেদ নিচে নেমে এলেন। সাবরিনা বেগম তখনো জায়নামাজে বসে আছেন। তার শরীরটা এখন অনেক দুর্বল। মনসুর আহমেদ তার পাশে গিয়ে বসলেন। ঘরের ভেতর একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। পুরনো খাট, কাঠের আলমারি আর আরিয়ানের ফেলে যাওয়া বইপত্র থেকে এক ধরনের বিষণœ ঘ্রাণ বেরোচ্ছে। আল মাহমুদের কবিতার বইটা আরিয়ানের পড়ার টেবিলে ধুলো জমিয়ে পড়ে আছে। মনসুর সাহেব একদিন সেই বইয়ের পাতা উল্টাতে গিয়ে দেখেছিলেন আরিয়ান সেখানে লিখে রেখেছে নিজের নাম। বাঁকা হাতের অক্ষরে লেখা সেই নামটা এখন তার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম।
সাবরিনা বেগম বললেন, আজকেও কি কেউ এলো না? মনসুর আহমেদের কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এলো। তিনি বললেন, আসবে সাবরিনা। আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের সবুর কবুল করবেন। মেঘেরা বড় অলস। ওরা হয়তো পথ ভুলে আজ অন্য ঠিকানায় চলে গেছে। কিন্তু দেখো একদিন ঠিকই সঠিক ঠিকানায় পৌঁছাবে। তুমি বরং আরিয়ানের সেই পছন্দের সুজির হালুয়াটা কাল করো। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে কাল সকালের বাতাসটা অন্যরকম হবে। একটা ঝিঁঝিঁ পোকা জানলার ধারে ডাকছে। সাবরিনা বেগম সেদিকে তাকিয়ে ভাবলেন, এই পোকামাকড়গুলোও কি কোনো বার্তা দেয়?
ঘরের কোণে রাখা টেবিল ক্লথটা টিকটিক করছে। সময় বয়ে যাচ্ছে। এক যুগ বা বারো বছর শুনতে ছোট মনে হয়। কিন্তু এই সময়টুকু পার করতে এই দম্পতির জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল একেকটি কালান্তরের মতো। মনসুর আহমেদ মাঝে মাঝে নিজের ভুলগুলো নিয়ে ভাবেন। কেন তিনি সেদিন অতটা কড়া হয়েছিলেন? কেন আরিয়ানের ছোট মনটা বুঝতে পারেননি? তার মনে হয় মানুষের জীবনের সবচাইতে বড় পাপ হলো নিজের আপনজনকে চিনতে না পারা। আরিয়ান যখন চলে যায়, তখন তার চোখে যে শূন্যতা ছিল, মনসুর আহমেদ তা পড়তে পারেননি। এখন সেই শূন্যতা তার নিজের চোখে বাসা বেঁধেছে। তিনি বুঝলেন, শাসন করার অধিকার কেবল তাকেই সাজে যে ভালোবাসার গভীরতা মাপতে জানে। নিজের অহংকার বিসর্জন না দিলে প্রকৃত বাবা হওয়া যায় না।
পরদিন ভোরবেলা। কুয়াশাচ্ছন্ন স্টেশন। কুয়াশা সাদা কাফনের মতো ঢেকে রেখেছে চরাচর। আবার নতুন ট্রেনের শব্দ। মনসুর আহমেদ আবার ছাদে। তার হাতে একটা পুরনো খাম। তাতে আরিয়ানের ছোটবেলার একটা ছবি। ছবিটা ঝাপসা। বৃষ্টির জল লেগে রঙের ছোপ পড়েছে।
মনসুর আহমেদ ছবির ওপর হাত বোলালেন। তার মনে হলো আরিয়ান তাকে ডাকছে। বাবা বলে ডাকছে। তিনি রেলিংয়ের একদম শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার মনে হলো বাতাস কানে কানে বলছে, আজ আসবে। আজ কেউ একজন আসবে। দূরের সিগন্যালটা তখন সবুজ থেকে লাল হলো। একটা ট্রেন ধীরগতিতে স্টেশনে ঢুকছে। চাকার আর্তনাদ মনসুর আহমেদের বুকের ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
ট্রেন থামল। ভিড় হালকা হওয়ার পর দেখা গেল একটি যুবক একা দাঁড়িয়ে আছে প্ল্যাটফর্মে। তার হাতে কোনো ব্যাগ নেই। পরনে একটা মলিন ফতুয়া। সে এক দৃষ্টিতে মনসুর আহমেদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। মনসুর আহমেদের বুকের ভেতর তখন সহস্র ঢাক বাজছে। তার পা কাঁপছে। তিনি চিৎকার করতে চাইলেন কিন্তু স্বর ফুটল না। যুবকটি ধীর পায়ে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে এলো। সে গেটের দিকে না গিয়ে সরাসরি রেললাইনের পাশ দিয়ে বাড়ির নিচের দিকে আসতে লাগল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে সেই কিশোর আরিয়ানের ছায়া। বুক ধকধকানি বেড়ে গেল মনসুর সাহেবের। তিনি সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলেন।
মনসুর আহমেদ আর দেরি করলেন না। তিনি পাগলের মতো সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলেন। তার বয়স্ক হাঁটুতে অনেক ব্যথা। হাড়ের ভেতরে কটকট শব্দ হচ্ছে। কিন্তু আজ যেন তিনি উড়ছেন। তার শরীরে কোনো জড়তা নেই। সাবরিনা বেগম রান্নাঘরে ছিলেন। মনসুরের পায়ের শব্দ শুনে তিনি বেরিয়ে এলেন। তার হাতে একটা স্টিলের খুন্তি। কী হয়েছে ওগো? ও মনসুর সাহেব! মনসুর আহমেদ কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন। বাইরের ঠা-া বাতাসে তিনি নতুন জীবন খুঁজে পেলেন।
সামনে সেই যুবক। তার দাড়িভরা মুখ। চোখে রাজ্যের ক্লান্তি। চোখের কোণে কালো দাগ। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। মনসুর আহমেদ তার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। যুবকটি তার বাবার দিকে তাকাল। তার চোখে জল টলমল করছে। সে নিচু স্বরে ডাকল, বাবা। মনসুর আহমেদ এই একটি শব্দের জন্য এক যুগ বেঁচে ছিলেন। তিনি যুবকটিকে জড়িয়ে ধরলেন। তার গায়ের গন্ধে আরিয়ানের সেই ছোটবেলার সাবানের ঘ্রাণ নেই। এখন সেখানে ধুলো, রোদ, কয়লার ধোঁয়া আর কষ্টের ঘ্রাণ। মনসুর আহমেদ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। তার অশ্রু আরিয়ানের মলিন শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছে। যুবকটি তার বাবার কাঁধে মুখ লুকালো। বারো বছর পর সে আবার সেই ছোট শিশুটি হয়ে গেল।
যুবকটি বলল, বাবা। আমাকে প্রকৃতির ওই মেঘপিয়নরা পাঠিয়েছে। আমি অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। চট্টগ্রামের এক জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডে কাজ করতাম। অনেকদিন কোনো স্মৃতি মনে পড়ত না। কিন্তু যেখানেই যেতাম, দেখতাম কালো মেঘগুলো আমার মাথার ওপর ঘুরছে। আমার মনে হতো আপনি ছাদে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকছেন। সেই ডাক আমি সইতে পারলাম না। আজ রাতে যখন বৃষ্টি শুরু হলো, আমার মনে হলো এই বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা আমাকে অভিশাপ দিচ্ছে। আমার মনে হলো আপনার শরীরটা আর ভালো নেই। আমি আর থাকতে পারলাম না। বাবা, আমাকে মাফ করবেন?
মনসুর আহমেদ ছেলেকে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। সাবরিনা বেগম তখন দরজায় দাঁড়িয়ে পাথর হয়ে আছেন। তার হাতে সেই খুন্তিটা তখনো ধরা। তার চোখে জল নেই। শুধু একটা ঘোরের মধ্যে তাকিয়ে আছেন। মনসুর আহমেদ বললেন, সাবরিনা দেখ। আমাদের সেই চিরচেনা পিয়ন আজ খবর নিয়ে এসেছে। সে আর দেরি করেনি। আরিয়ান মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ল। সাবরিনা বেগমের হাত থেকে খুন্তিটা পড়ে গেল মেঝের ওপর। টং করে একটা শব্দ হলো। তিনি আরিয়ানের মাথায় হাত রাখলেন। তার খসখসে আঙুলগুলো ছেলের চুলে বিলি কাটতে লাগল। এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক চিরে। বারো বছরের সেই জমে থাকা পাথরটা এক মুহূর্তেই গলে জল হয়ে গেল। তিনি নিচু হয়ে আরিয়ানের কপালে একটা চুমু খেলেন। সেই চুমুতে মায়ের সব হাহাকার ধুয়ে মুছে গেল।
সেদিন রাতে খাবার টেবিলে দীর্ঘক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। সাবরিনা বেগম আরিয়ানের পাতে ইলিশ মাছের বড় পেটি তুলে দিলেন। আরিয়ান মুখ নিচু করে খাচ্ছিল। মনসুর আহমেদ দেখলেন ছেলের হাতের তালুগুলো কেমন শক্ত হয়ে গেছে। জায়গায় জায়গায় কড়া পড়েছে। হয়তো লোহার কাজ করতে গিয়ে আঙুলে ক্ষত হয়েছে। জীবনের লড়াই তাকে ভেতর থেকে পাথর করে দিয়েছে। মনসুর আহমেদের মনে হলো, এই ক্ষতগুলো আসলে তার দেওয়া সেই চড়ের চেয়েও অনেক বেশি গভীর। তিনি বুঝলেন, ক্ষমা চাইলেই বারো বছর ফিরে আসে না। কিন্তু ক্ষমার চেয়েও বড় এক শক্তি এখন এই টেবিলে বসে আছে। তার নাম মায়া। মানুষের ভালোবাসা সব ক্ষত মুছে দিতে না পারলেও তার ওপর প্রলেপ দিতে পারে। আরিয়ান একসময় মাথা তুলে তাকালো। দেখল তার বাবার থালা তখনো খালি। সে বলল, বাবা, খাচ্ছেন না কেন? মনসুর আহমেদ শুধু হাসলেন। তার পেট আজ কানায় কানায় ভরা।
বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আকাশের পিয়নরা তাদের কাজ শেষ করে ঝরঝর করে ঝরছে। মনসুর আহমেদের স্টেশনের পাশের সেই তিনতলা বাড়িটা আজ আর কোনো পাগলাটে মানুষের বাড়ি নেই। আজ সেই বাড়িটা একটা শান্ত তপোবন। ট্রেনের বাঁশি বাজছে। কিন্তু মনসুর আহমেদ আর ছাদের দিকে তাকালেন না। তার আর কোনো ট্রেনের খবর নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি এখন তার হারিয়ে যাওয়া ধনকে ফিরে পেয়েছেন। তার মনে হলো মানুষের ঘরটাই আসল ঠিকানা। আর বাকি পৃথিবীটা হচ্ছে এক বিশাল মেঘের ডাকঘর। সেখানে সবাই বার্তাবাহক। কেউ সংবাদ আনে, কেউ নিয়ে যায়। আর কেউ কেউ সারা জীবন কেবল খাম খোলার প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। যারা ফিরে আসে, তারা জানে ফেরার আনন্দ কত মধুর। আর যারা অপেক্ষায় থাকে, তারা জানে সময়ের প্রতিটি সেকেন্ড কত দীর্ঘ। মায়ার বাঁধন বড় কঠিন বাঁধন। একবার ছিঁড়লে তা জোড়া লাগানো যায়, কিন্তু দাগ থেকে যায় আজীবন।
রাত বাড়ছে। স্টেশনের বাতিগুলো বৃষ্টির ঝাপটায় দুলছে। মনসুর আহমেদের ঘরের জানলা দিয়ে এক চিলতে হলদে আলো বাইরে আসছে। সেই আলোয় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো হীরের মতো জ্বলছে। সেখানে এখন আর কোনো দীর্ঘশ্বাস নেই। শুধু আছে পরম তৃপ্তি। মেঘেরা আজ শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের পকেটে আর কোনো ভারী চিঠি নেই। তারা আজ ভারমুক্ত। তারা এখন জানে এই বাড়ির ঠিকানাটা আর কারো কাছে গোপন নেই। মনসুর আহমেদ আরিয়ানের ঘরে গিয়ে দেখলেন, সে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার ঘুমের ঘোরেও সে যেন কোনো এক ট্রেনকে ধরতে চাইছে। মনসুর সাহেব তার গায়ে চাদরটা টেনে দিলেন। তিনি এখন মুক্ত। তার প্রতীক্ষার এক যুগ শেষ হয়েছে। আকাশের মেঘগুলো আজ খুব নিরিবিলি। জানালার ওপাশে ঝিরঝিরে হাওয়ায় মেঘেরা সরে যাচ্ছে। মনসুর আহমেদ আকাশের অসীম শূন্যতার দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, এই পৃথিবীতে কোনো ডাকই আসলে বিফলে যায় না। হৃদয়ের গভীর থেকে কেউ যখন কাউকে ডাকে, তখন সেই বার্তা কোনো না কোনোভাবে ঠিকই পৌঁছে যায়। শুধু সময়ের ব্যবধানে কেবল ডাক আর সাড়া দেওয়ার সুরটুকু চিনে নিতে হয়।