প্রতিবেশী দেশের আশ্রয়ে থাকা আওয়ামী নেত্রী শেখ হাসিনা এখন রীতিমত দেশটির জন্য গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছেন বলেই দৃশ্যত মনে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দণ্ডিত এ রাজনীতিককে দেশটি ফেরৎ দিতে বাধ্য হলেও মানবাধিকার ইস্যু সহ নানা অজুহাতে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিচ্ছে না। সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও ভারত বাংলাদেশকে চাপে রেখে তাদের স্বার্থ উদ্ধারের অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তো প্রতিনিয়তই বাংলাদেশ দখল করে নেয়ার হুমকি দিয়ে এসেছেন দীর্ঘদিন থেকেই। বাংলাদেশকে একেবারে মশা-মাছির সাথে তুলনা করতেও তিনি কসূর করছেন না। কিন্তু তিনি বেমালুম ভুলে গেছেন যে, বাংলাদেশ কোনভাবেই ভারতের ওপর নির্ভরশীল নয় বরং পুরো পশ্চিম বাংলার অর্থনীতির চাবিকাঠি এখন পুরোপুরি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক এক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে পলাতক শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। ছাত্র-জনতার আন্দোলনও তাকে দেশ থেকে বিতাড়নের জন্য ছিলো না। দাবি ছিলো পদত্যাগের। কিন্তু তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। গণহত্যার অপরাধে আদালতে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। সরকার তাকে দেশে ফেরৎ আনার জন্য ভারত সরকারের কাছে বারবার নোট ভার্বাল পাঠাচ্ছে। কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই দেশে আসতে চান, তাহলে কোন কিছু এতে প্রতিবন্ধক হবে বলে মনে হয় না।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন একথা দলটির অন্ধ ভক্তরা কখনো স্বীকার করেন না। তাদের দাবি, শেখ হাসিনা টুঙ্গীপাড়া যাওয়ার জন্য হেলিকপ্টারে উঠেছিলেন। কিন্তু তাকে প্রতারণা করে দিল্পিতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন খোদ ভারতের পররাষ্ট্্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর। তিনি সম্প্রতি লোক সভায় এক বক্তৃতায় বলেছেন, শেখ হাসিনা তাকে ভারতে সাময়িক আশ্রয় দেয়ার আবেদন করেছিলেন। এতে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীদের মিথ্যাচারের বিষয়টি খুবই সুস্পষ্ট। আর শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, ‘তিনি ইচ্ছা করলেই দেশে ফিরতে পারবেন না বরং এর আইনানুগ নানা বিষয় জড়িত’।
মূলত, ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা বেশ আলোড়ন তুলেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মাঠে। এনিয়ে ইতোমধ্যেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। কিন্তু একদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় খোদ তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রমও নিষিদ্ধের মতো প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার ফিরতে পারার মতো পরিস্থিতি আদৌ কতটা রয়েছে, তা নিয়েও আছে নানা ধরনের আলোচনা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক জনরোষের মুখে দেশ ছাড়তে হয়েছিল আওয়ামী লীগের এ শীর্ষ নেতাকে। দু’বছর পর এসে সে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হবার কোনো নজির নেই।
ফলে শেখ হাসিনা জনগণের সিদ্ধান্তের বিষয়ে যে কথা বলছেন, তার জোরালো ও নৈতিক ভিত্তি নেই। এছাড়া শেখ হাসিনা যে সময়সীমা দিয়েছেন, তা আসতে এখনও আরও পাঁচ মাস বাকি। ফলে তার দেশে ফেরার এ দাবি অনেকের ভাষ্যমতে কেবলই ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি’, নাকি আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে সক্রিয় করার কৌশল তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।
এছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় যেমন দলটির তৎপরতা চালানো সম্ভব নয়, একইসাথে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে চলা মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার দিকটি মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘সম্পূর্ণ বৈরি’ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। তাই বর্তমান পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য এবং শেখ হাসিনার ফেরার জন্য খুবই প্রতিকূল বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া প্রায় দু’বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবার পর থেকেই এর সাথে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হারে মামলা ও গ্রেফতারের খবর এসেছে গণমাধ্যমে। এমনকি কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দেশের ভেতরে থাকা অনেক নেতাকর্মীই এখনও আত্মগোপনে রয়েছেন। বিভিন্ন সময় দলকে সক্রিয় করতে বের করা ঝটিকা মিছিল থেকেও আটক হয়েছেন অনেকে।
মূলত, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চিত। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং অসংখ্য হত্যা মামলার আসামী হওয়ায় দেশে ফেরা মাত্রই তাকে সরাসরি কারাগারে যেতে হবে। তার এ প্রত্যাবর্তন মূলত নির্ভর করছে আইনি প্রক্রিয়া, ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রয়েছে। এছাড়া বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তিনি মৃত্যুদণ্ডাদেশ পেয়েছেন। সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তিনি দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী বিচারপ্রক্রিয়া চলবে। ভারতের আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। ভারত তাকে ফেরত পাঠাবে কি না, তা নির্ভর করবে দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও প্রত্যর্পণ চুক্তির ওপর। দলীয় নেতাদের একাংশের মতে, এ মুহূর্তে দেশে ফেরা তার জন্য বিশাল আইনি ও শারীরিক সুরক্ষার ঝুঁকি, যা আওয়ামী লীগের অস্তিত্বের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষকরা তার এ ঘোষণাকে রাজনৈতিক চাল বা ঝুঁকি হিসেবেই দেখছেন। সার্বিকভাবে, কোনো আইনি নিশ্চয়তা বা রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া তার দেশে ফেরা প্রায় অসম্ভব।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে খোদ ভারতেই নানাবিধ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। খোদ ভারতীয়রাই বলতে শুরু করেছেন হাসিনাকে দিল্লিতে রেখে বাংলাদেশে কেন আমরা ভারত বিদ্বেষের চাষ করব। কেন্দ্রীয় সরকার যদি ভারত থেকে অবৈধ বাংলাদেশীদের বিতাড়িত করতে চায় তাহলে শেখ হাসিনাকে দিয়েই সেটা শুরু করা উচিত। বিক্ষুব্ধ ভারতীয়দের প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের করের টাকায় বাংলাদেশ থেকে গণ-অভ্যুত্থানে জনগণের রোষাণল থেকে পালিয়ে আসা প্রধানমন্ত্রীকে ভরণপোষণ করে কেন আমরা বাংলাদেশী পর্যটক হারাব। এর জন্য কেন হাজার হাজার কোটি রুপি লোকসান দিতে হবে। ভারতীয় কলামিস্ট মহুয়া গগৈ তার কলামে লিখেছেন, যেভাবে শুভেন্দু অধিকারীরা বাংলাদেশীদের মনে ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা করেছেন তাতে ভিসা চালু হলেও কাক্সিক্ষত বাংলাদেশী পর্যটক পাওয়া বেশ কঠিনই হবে।
পরিস্থিতি আরো বেকায়দায় দাঁড়িয়েছে তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর। ২০১৫ সালের মধ্যে মোংলা বন্দরে ভারতীয় বিনিয়োগ চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়ার কথা থাকলেও দিল্লি তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো বাংলাদেশে সোনাদিয়া বন্দরে চীনা বিনিয়োগ আসতে দেয়নি ভারত। তিস্তা চুক্তি বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। গঙ্গা চুক্তি নবায়নের সময় চলে এসেছে। অথচ সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা বন্ধ হয়নি। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে গিয়ে কোন দেশের সাথে কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলবে তার জন্য দিল্লির অপেক্ষায় বসে নেই ঢাকা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকাকে চাপে ফেলতে দিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফ পর্যায়ে সীমান্ত সম্মেলন হওয়ার পরও পুশইন অব্যাহত রেখেছে ভারত। কিন্তু ঢাকাও বসে নেই। চীন সফরের পর সৌদি আরবের প্রিন্স বিন সালমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তার দেশে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বাংলাদেশ চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, তুরস্কসহ কোন দেশের সাথে কিভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলবে তার জন্য দিল্লির পরামর্শ বা কোনো প্রয়োজনের তোয়াক্কা করছে না। ২৪-উত্তর বাংলাদেশের এ ধরনের বিস্ময়কর পরিবর্তন দেখেও ভারত এখনো তার বাংলাদেশ নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন মনে না করে উল্টো অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। এ প্রেক্ষাপটেই এ বছরেই হাসিনা দেশে ফিরবেন এমন ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
ভারতীয় ইউটিউব চ্যানেলগুলোতে একসময়ের বিবিসিখ্যাত সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক ও প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ার সভাপতি গৌতম লাহিড়ী বিভিন্ন সময়ে বাতলে দিচ্ছেন কিভাবে বাংলাদেশে হাসিনা ফিরবেন, কিভাবে তার দলের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হচ্ছেন, প্রবাসী আওয়ামী লীগাররা কিভাবে হাসিনার সাথে শলাপরামর্শ করে আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করছে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি মোটেই ভালো নয়, ইউনুস সরকারের রেখে যাওয়া রাজনৈতিক দর্শনই অনুসরণ করে চলেছে নির্বাচিত সরকার ইত্যাদি। এ ধরনের অপপ্রচারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের টেলিভিশন টকশো ও বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলে আওয়ামী লীগের প্রাসঙ্গিকতা তৈরির চেষ্টা চলছে। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে শেখ হাসিনার কাছের ও চাটুকার সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতজনরা বলতে শুরু করেছেন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে বয়ান দিচ্ছেন তারা। শেখ হাসিনা যে গুম খুন করে জনরোষে গণ-অভ্যুত্থানে ভারত পালিয়ে গেছেন একথা মুখেও আনছেন না তারা। হাসিনা ফিরে আসার এসিড টেস্ট হিসেবে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় বা প্রতীকবিহীন নির্বাচনে অংশ নেয়ার সম্ভাবনাকে ইনিয়ে বিনিয়ে উপস্থাপন করছেন তারা। তারা বলছেন, সংসদে কার্যত কোনো বিরোধী দল নেই। বিরোধীদল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই প্রয়োজন। তাই আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। যা কোন ভাবেই যৌক্তিক ও কাক্সিক্ষত নয়।
সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী ও সুবীর ভৌমিকের ভাষায় হাসিনা দিল্লিতে তো আর বসে থাকেননি। এনডিটিভিতে হাসিনার সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থাপনার সাথে নিজের জড়িত থাকার কথা খোলাখুলি স্বীকার করছেন সুবীর। তারা বলছেন, হোয়াটস অ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে হাসিনা গত দু’বছরে বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের পুনর্গঠিত করেছেন। এরই মধ্যে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের কাজ সুচারুরূপে শেষ করার পর যুবলীগের কমিটি গঠনের কাজে হাত দিয়েছেন। ভারতে আশ্রিত আওয়ামী নেতাকর্মীদের দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন হাসিনা। সাড়াও পেয়েছেন প্রচুর। আওয়ামী সমর্থক যুবকরা খালি হাতে বাংলাদেশে ফিরবে না বলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের উদাহরণও টেনেছেন সুবীর। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের দিল্লিতে আওয়ামী লীগের দাফন হয়ে গেছে এমন বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে খিস্তিখেউড় আউড়াতে ভুল করছেন না এ দুই ভারতীয় সাংবাদিক। সালাউদ্দিন আহমেদকে ‘হরিদাস পাল’ সম্বোধন করে ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলা হচ্ছে বাপের বেটা হলে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে নির্বাচন দিয়ে দেখ বিএনপির ২১৩ সিট ২১-এ নামে কি না। যা আমাদেরকে ফ্যাসিবাদী উন্মত্ততার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
ভারতীয় ইউটিউব চ্যানেলগুলোতে ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে কেন কূটনীতিক, আমলা, সরকারি কর্মকর্তাকে হাইকমিশনার হিসেবে না পাঠিয়ে দিনেশ ত্রিবেদিকে ঢাকায় পাঠানো হলো। বাংলাদেশে র্যাডিকেল সমাজ থাকলে, ভারতবিদ্বেষী সমাজ থাকে তার প্রভাব ভারতে পড়বেই। এজন্য ভারত পররাষ্ট্রনীতিতে এ্যাসার্টিভ উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের সাথে যাতে জনসংযোগ গড়ে তুলতে পারেন সে কারণেই রাজনীতিবিদ হিসেবে দিনেশ ত্রিবেদিকে পাঠানো হয়েছে এবং তৃতীয় প্রধান হিসেবে তিনি যেন সরাসরি বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। কিন্তু ত্রিবেদি শুরুতেই ভারত ও বাংলাদেশের জনগণকে এক করে দেখলেন এবং বললেন দু’দেশ একসাথে চলতে পারলে বিশ্বশক্তিতে পরিণত হতে পারবে। ত্রিবেদির এ বক্তব্য বাংলাদেশের মানুষের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ মন্তব্য করেছেন শেখ হাসিনার মৃত্যু হবে কারাগারে অথবা নির্বাসনে। এক্সে দেয়া এক মন্তব্যে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের কোনো জায়গা নেই। আওয়ামী লীগ যত দ্রুত এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে সংস্কারের পথে এগোবে ততই বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে। জন ড্যানিলোভিচ বাংলাদেশে উপরাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। জন ড্যানিলোভিচের এ বক্তব্যে বুঝা যায় দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে মার্কিন সম্পর্ক যে ভারতকেন্দ্রিক ছিল তার পরিবর্তন ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের সাথে সরাসরি আরো নিবিড়ভাবে যুক্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশকে কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প বা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের অংশ না দেখে জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার অংশীদার হিসেবে দেখে।
এক প্রতিবেদনে হিন্দুস্তান টাইমস বলেছে-ভারতের কূটনৈতিক মানচিত্র প্রতিনিয়ত নতুন করে আঁকা হচ্ছে এবং নয়াদিল্লি নিজেকে চীনের উত্থান, আমেরিকার নীতি পুনানির্ধারণ এবং আঞ্চলিক উদ্বেগে গঠিত এক উদীয়মান ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করছে। ‘পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক’ আলোচনায় নির্বাহী সম্পাদক শিশির গুপ্ত এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৃহত্তর পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা থেকে ‘কার্যত সরে আসা’ এবং ওয়াশিংটন এখন সরাসরি চীনের ওপর মনোনিবেশ করার কথা বলেছেন। এ আলোচনায় তিনি বলেছেন আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীনের সহায়তা নিয়ে তিস্তা নদী প্রকল্প বা চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার বিষয়টি ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ তিস্তা নদীর অধিকাংশ অংশ ভারতে অবস্থিত এবং এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেন’স নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরের খুব কাছে। তবে মিয়ানমারের অস্থিতিশীল অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে এ ধরনের করিডোর বাস্তবে রূপ দেয়া বেশ কঠিন। মিয়ানমার-বাংলাদেশ-চীন করিডোর গঠনের বিষয়টিকে একটি ‘দিবাস্বপ্ন’ হিসেবে দেখার কারণ হচ্ছে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সুসম্পর্কের অভাব। চীন যদি পাকিস্তান বা অন্য দেশের মাধ্যমে ভারতকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, তবে ভারতও তার জবাব দিতে প্রস্তুত।
শেখ হাসিনা ভারতে তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি উভয় সঙ্কটে আছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার পর এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক দাবি আসায় তাকে নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছে ভারত সরকার। আশ্রয় দেয়ার পর হাসিনাকে হস্তান্তরে ভারত আইনগতভাবে বাধ্য হলেও, রাজনৈতিক আশ্রয় বা মানবাধিকারের কারণ দেখিয়ে তাকে ফেরত দিচ্ছে না ভারত। হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো ভারতের পুরনো মিত্রকে ছেড়ে দেয়ার মতো বিষয় হলেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনেক পাল্টে গেছে। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে বাংলাদেশ সরে আসায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ ঢাকার সাথে নতুন করে সম্পর্ক ও সহযোগিতা স্থাপন করতে চাইছে। তেমনি তাকে আটকে রাখলে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের পথে বিষয়টি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ভারতীয়রা চাচ্ছেন না হাসিনার কারণে বাংলাদেশের সাথে তাদের বাণিজ্য বিনষ্ট হোক। হাসিনা ইস্যুতে ভারতের এ সামগ্রিক উভয়সঙ্কট ও জটিলতা কাটাতে বাস্তবে এগিয়ে আসতে হবে দিল্লিকেই।
জুলাই বিপ্লবের পর ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা মাঝে মাঝেই দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করে এসেছেন। এমনকি তিনি ‘চট করে’ দেশে ঢুকে পড়ার ঘোষণা দিয়েছেন এর আগে। কিন্তু বাস্তবতা তার অনুকূলের কথা বলে না। তবে সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে কোন রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া শেখ হাসিনার পক্ষে দেশে ফিরে আসার কোন সুযোগ নেই। কারণ, তিনি ইতোমধ্যেই প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আরো অসংখ্য মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এমতাবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়ে তার দেশে ফেরা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। বয়স, শরীর-স্বাস্থ্য ও মানসিকতাও তার অনুকূলে কথা বলে না। তাই তার দেশে ফেরার প্রচারণা অলীক কল্পনা বৈ কিছু নয়!
www.syedmasud.com