॥ নাছির উদ্দিন শোয়েব ॥
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, স্বাধীনতার ঘোষক এবং দেশের সপ্তম রাষ্ট্রপতি। ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা। একজন নন্দিত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জিয়াউর রহমান শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক নন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে আছেন। তার আদর্শ, দেশপ্রেম ও দূরদর্শী নেতৃত্ব স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখেছে। এমন একজন মানুষকে অল্প সময়ের ব্যবধানে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো কেন? ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বিপথগামী একদল সেনাসদস্যের হাতে শহীদ হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। শুধু হত্যা করেই শেষ নয়- তার লাশ গায়েব করার জন্য গোপনে কবর দেয়া হয় নির্জন স্থানে পাহাড়ের পাদদেশে। পরবর্তীতে তার লাশ খুঁজে বের করে ঢাকায় এনে দাফন করা হয়।
সিপাহীজনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দুঃসময়ে দেশের হালধরা এমন একজন রাষ্ট্রনায়ককে এভাবে হত্যা করার উদ্দেশ্য কি ছিল? হত্যাকা-ে জড়িত অভিযোগে বিপথগামী কয়েকজন সেনার নাম আসলেও প্রকৃতপক্ষে জিয়াউর রহমানকে হত্যার উদ্দেশ্য কি তা অস্পষ্ট। হত্যাকা-ের পর গঠিত সামরিক আদালতে (কোর্ট মার্শাল) মোট ১৮ জন সেনা কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করে দ- দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১৩ জনকে মৃত্যুদ- (ফাঁসি) এবং বাকি ৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়। হত্যাকা-ে দ-িত তৎকালীন ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন পলাতক থাকা অবস্থায় মারা যায়। অন্যতম পলাতক মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামী মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন ৪৫ বছর আত্মগোপনে থাকার পর গত বুধবার ঢাকায় গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। তাকে কোর্ট মার্শালের জন্য সেনা হেফাজতে দেয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো-দীর্ঘ ৪৫ বছর পর দেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং লোমহর্ষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা রহস্য উন্মোচন হবে কি? মোজাফফর হোসেন গ্রেফতারের পর জাতি অধীর আগ্রহে তা জানার জন্য অপেক্ষা করছে।
যদিও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ের পর পলাতক থাকা অবস্থায় মোজাফফর হোসেনের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তার দাবি, ঘটনার সময় তিনি জিয়াউর রহমানের খুব কাছে থাকলেও জানতেন না যে ঘাতকরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করবে। তার বক্তব্য হচ্ছে- তিনি ভেবেছিলেন- জিয়াউর রহমানকে সার্কিট হাউস থেকে তুলে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদেরকে পাঠানো হয়েছে। তবে এমন তথ্যও রয়েছে যে, হত্যাকা-ের পর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ২৪ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল আবুল মনজুরকে মেজর মোজাফফর হোসেন ফোন করে জানান, ‘দ্য রাষ্ট্রপতি হ্যাজ বিন কিলড।’ তারপর লাশ গায়েবের সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। এখানেও মোজাফফরের বক্তব্য রয়েছে যে, তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল জিয়াউর রহমানের লাশ পাহাড়ের জঙ্গলে নিয়ে ফেলে দেয়ার জন্য, কিন্তু তিনি তা না করে গ্রামের লোকদের সহায়তা নিয়ে কবর দিয়েছেন। এসময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ পালনে বাধ্য হয়েছিলন।
তবে দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে পক্ষে বিপক্ষে নানা বক্তব্য আসলেও জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ের একমাত্র জীবিত আসামী মোজাফফর হোসেন গ্রেফতার হওয়ায় তার কাছ থেকে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক তা সবাই চায়। বিশেষ করে জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ে কোন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি ভূমিকা ছিল, মোজাফফর এতদিন কোথায় ছিল, ভারতে আশ্রয় পেয়েছিল কিভাবে, নাম পরিচয়ে গোপন করে ভারত এবং বাংলাদেশে আসা যাওয়ায় কারা সহায়তা দিয়েছে এ বিষয়ে অনেক তথ্য জানার আছে তার কাছে। মোজাফফরকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান হত্যার প্রকৃত রহস্য বের করার এখনই সময়। অতীতের মতো তড়িঘড়ি করে দ- কার্যকর না করে জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে সত্য বের করে আনতে হবে। যেহেতু বর্তমানে তিনি সেনা হেফাজতে সেনা গোয়েন্দাদের কাছে আছেন তারাই পারবে প্রকৃত তথ্য বের করতে। বিশ্লেষকরা মনে করেন-মোজাফফরের কাছ থেকে প্রাপ্ত সঠিক তথ্য জানার আগ্রহ এবং অধিকারও রয়েছে সাধারণ মানুষের।
তথ্য রয়েছে-মেজর মোজাফফর হোসেন প্রথম জিআরবিতে (জাতীয় রক্ষী বাহিনী) কমিশন্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। ১৯৮১ সালে তিনি ২৪ পদাতিক ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ের পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতে অবস্থান করেন এবং সেই সময় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার আশ্রয়ে ছিলেন বলে জানা যায়। ওই সময় তিনি ‘বিপ্লব সরকার’ ও ‘জয় ব্যানার্জি’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। পরে ১৯৯৬ সালে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এরপর তিনি কোথায় কিভাবে ছিলেন তা প্রকৃত অর্থে অজানা।
১৯৮১ সালের সেনা বিদ্রোহ এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই কমিটিতে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ডিজিএফআই, এনএসআই, প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশ এবং প্রয়োজনে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে পরিচালনার স্বার্থে মেজর মোজাফফর হোসেনকে ডিজিএফআই-এর জয়েন্ট ইন্টাররোগেশন সেন্টার (জেআইসি) অথবা সেনাবাহিনীর আর্মি ইন্টাররোগেশন সেল (এআইসি)-এ জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট তথ্য উদ্ঘাটনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তার ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে জিয়া হত্যাকা-ের একটা বর্ণনা দিয়েছেন। বইটির ত্রয়োদশ অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন, হামলাকারীরা সার্কিট হাউসের কক্ষগুলোতে জিয়াউর রহমানকে খুঁজছিলেন। গোলাগুলীর শব্দ শুনে জিয়া কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে তার সবচেয়ে কাছে ছিলেন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, মোজাফফর তখন দৃশ্যত কাঁপছিলেন। মোসলেহউদ্দিন জিয়াকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বইটিতে বলা হয়েছে, মোজাফফর ও মোসলেহউদ্দিন তখনো মনে করছিলেন, জিয়াকে হত্যা নয়, সার্কিট হাউস থেকে তুলে নেওয়া হবে। এরপর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান সামনে এসে সাবমেশিনগান দিয়ে জিয়াকে গুলী করেন। বইটিতে উল্লেখ রয়েছে, সার্কিট হাউস থেকে সেনানিবাসে ফেরার পথে মোজাফফর মোসলেহউদ্দিনকে বলেছিলেন যে তিনি জানতেন না যে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হবে; তার ধারণা ছিল, জিয়াকে শুধু সার্কিট হাউস থেকে বের করে আনা হবে। এটি অবশ্য মাসকারেনহাসের বইয়ে মোজাফফরের নামে দেওয়া বক্তব্য। কোনো আদালতে শপথ নিয়ে দেওয়া বা জেরার মাধ্যমে যাচাই করা সাক্ষ্য নয়। মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, মোজাফফরের ভূমিকা হত্যার মুহূর্তে উপস্থিত থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হত্যাকা-ের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সেনাসদস্যদের নিয়ে আবার সার্কিট হাউসে যান। বইটিতে বলা হয়েছে, তারা জিয়ার শোবার ঘরে তল্লাশি চালান। ‘গোপন কাগজপত্র’ ও জিয়ার ব্যক্তিগত ডায়েরি খোঁজা হয়। তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি পুরোনো স্যুটকেসে ভরা হয়। এরপর জিয়া এবং নিহত দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার লাশ কাপড়ে মুড়িয়ে সামরিক যানে করে নিয়ে যাওয়া হয়। মাসকারেনহাস আরও লিখেছেন, পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মঞ্জুর ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেন। এই বর্ণনা সঠিক হলে ‘হত্যার পরিকল্পনা জানতেন না’-মোজাফফরের কথিত দাবি হত্যার পর তার ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর দেয় না। কারণ, হত্যার পরও তিনি বিদ্রোহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন, সার্কিট হাউসে ফিরে গিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সামরিক তৎপরতায় অংশ নিয়েছিলেন। বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর মঞ্জুর ও সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা ১ জুন ভোরে চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালান। মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, সামনের জিপে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব, মেজর মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মুনীর। পথে সরকার-অনুগত সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলীতে মতিউর রহমান ও মাহবুব নিহত এবং মুনীর গ্রেপ্তার হন। গোলাগুলীর মধ্যে মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। বইটি প্রকাশের সময়ও তিনি পুরস্কার ঘোষিত পলাতক ছিলেন।
তথ্য অনুযায়ী-জিয়াউর রহমান হত্যাকা-র পর ১৮ জন সেনা কর্মকর্তাকে দ- দেয়া হয়। এরমধ্যে-মৃত্যুদ-প্রাপ্ত (ফাঁসি হওয়া) ১৩ জন কর্মকর্তা: ১. ব্রিগেডিয়ার মহসিন উদ্দিন আহমেদ। ২. কর্নেল নওয়াজেশ উদ্দিন। ৩. কর্নেল এম আবদুর রশীদ। ৪. লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ ওয়াই এম মাহফুজুর রহমান। ৫. লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম দেলোয়ার হোসেন। ৬. লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহ মো. ফজলে হোসেন। ৭. মেজর এ জে গিয়াসউদ্দিন আহমেদ। ৮. মেজর রওশন ইয়াজদানী ভূঁইয়া। ৯. মেজর কাজী মোমিনুল হক। ১০. মেজর মুজিবুর রহমান। ১১. ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার। ১২. ক্যাপ্টেন জামিল হক। ১৩. লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ রফিকুল হাসান খান। (১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই ১৩ জন কর্মকর্তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।) কারাদ-প্রাপ্ত কর্মকর্তা: ১. ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন: তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়েছিল। (বাকি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান ও সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কার করা হয়)। মোজাফফরের পলাতক জীবনের একটি অংশের তথ্য পাওয়া যায় মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে। মইনুল হোসেন চৌধুরীর বইয়ের সংশ্লিষ্ট অংশের ইংরেজি অনুবাদ উদ্ধৃত করে মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ ২০১৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারে একটি অনুসন্ধানী নিবন্ধ লিখেছিলেন। লিফশুলৎজ জানিয়েছেন, মইনুল নিজেই তাকে বইয়ের ওই অংশের ইংরেজি অনুবাদ পাঠিয়েছিলেন। মইনুল হোসেন চৌধুরী লিখেছেন, তিনি ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত থাকাকালে জিয়া হত্যাকা-ের পলাতক অভিযুক্ত মেজর এস এম খালেদ ব্যাংককে অবস্থান করছিলেন। একই ঘটনায় পলাতক মোজাফফর তখন ভারতে ছিলেন। মইনুলের ভাষ্য অনুযায়ী, মোজাফফর ভারত থেকে ব্যাংককে গিয়ে খালেদকে সঙ্গে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন। জিয়াউর রহমান কীভাবে নিহত হয়েছিলেন, তা জানার জন্য তিনি তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। খালেদ ও মোজাফফরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে মইনুল লিখেছেন, চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে সার্কিট হাউস থেকে তুলে সেনানিবাসে আনার পরিকল্পনা করেছিলেন। ওই কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনায় নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব ও মেজর খালেদ। মেজর জেনারেল মঞ্জুর পরিকল্পনাটি আগে থেকে জানতেন না। জিয়াকে চাপ দিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা এবং শাহ আজিজুর রহমানসহ কয়েকজন মন্ত্রীকে অপসারণ করানো ছিল তাদের উদ্দেশ্য। তারা মইনুলের কাছে দাবি করেছিলেন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের হয়রানি এবং তাদের ব্যাপকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলি করার ঘটনায় জুনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সার্কিট হাউসের ঘটনা সম্পর্কে মইনুল লিখেছেন, জিয়া কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পর মতিউর রহমান খুব কাছ থেকে তাকে গুলী করেন। অন্য কর্মকর্তারা আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন এবং তারা গুলী চালাননি-খালেদ ও মোজাফফরের দেওয়া বিবরণের ভিত্তিতে মইনুল এমনটাই লিখেছেন। মইনুলের বইয়েও মোজাফফরকে গুলীবর্ষণকারী বলা হয়নি। তবে খালেদ ও মোজাফফরের বক্তব্য আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে কোন তথ্যটি মোজাফফর দিয়েছিলেন আর কোনটি খালেদের বক্তব্য, তা স্পষ্ট নয়। সম্প্রতি গ্রেপ্তারের পর মোজাফফরের নিজের কোনো বক্তব্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের নথি, পুরোনো সামরিক তদন্তের ফলাফলও জনসমক্ষে আসেনি। ফলে ঐতিহাসিক বইয়ে তার নামে দেওয়া বক্তব্য এবং পুলিশের বর্তমান অভিযোগ-দুটিই এখন আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বিচারিক যাচাইয়ের অপেক্ষায়।
এ বিষয়ে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্যে বলা হয়েছে, স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান হত্যাকা-, পরবর্তী সেনা বিদ্রোহ, মেজর জেনারেল এমএ মঞ্জুরের মৃত্যু এবং সেই সময়ের রাজনৈতিক-সামরিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় ঘটনাগুলোর নেপথ্যের প্রকৃত চিত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, মেজর মো. মোজাফফর হোসেন ১৯৮১ সালের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বর্তমানে তিনিই একমাত্র জীবিত। দীর্ঘদিন পলাতক থাকায় তার বক্তব্য ও তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। তার সাম্প্রতিক গ্রেফতার বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন অমীমাংসিত দিক উন্মোচনের পাশাপাশি জাতির সামনে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিদ্যমান নথি ও প্রমাণের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি যাচাই করার প্রয়োজন।
লেখক : সাংবাদিক