বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলোÑ রাষ্ট্র কার? জনগণের, নাকি ক্ষমতাবান কিছু ব্যক্তি ও পরিবারের? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। সংবিধান, আইন, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু যখন রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা পরিবারকেন্দ্রিক প্রভাব দৃশ্যমান হতে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্ন সামনে আসেÑ রাষ্ট্র কি সত্যিই জনগণের, নাকি কিছু প্রভাবশালীগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ শুধু রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো, ভৌগোলিক নামকরণ কিংবা জনপরিসরের পরিচয় সাধারণত সেই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জনগণের চেতনাকে ধারণ করে। একটি ইউনিয়ন, উপজেলা, সড়ক, সেতু বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নামকরণ কেবল আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; এর মধ্য দিয়ে একটি জাতির স্মৃতি, সংগ্রাম ও পরিচয় সংরক্ষিত হয়। কিন্তু যখন এসব নামকরণ ব্যক্তি বা পরিবারের প্রভাব প্রতিষ্ঠার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা শুধু অনৈতিকই নয়; বরং রাষ্ট্রচিন্তার জন্যও বিপজ্জনক সংকেত বহন করে। কারণ তখন রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও কাঠামোকে জনগণের যৌথ সম্পদ হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতাসীনদের ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা তৈরি হয়।

সম্প্রতি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন ইউনিয়নের নাম “মীরবাড়ি” রাখা হয়েছে, যা প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ‘মীর’ বংশের নাম থেকে নেওয়া হয়েছে বলে আলোচনায় এসেছে। একইভাবে “মোকামতলা” নামে নতুন উপজেলা গঠনের পর সেখানে “সীমান্ত”, “দিগন্ত” ও “স্বর্ণগ্রাম” নামে তিনটি নতুন ইউনিয়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে “সীমান্ত” ও “দিগন্ত” প্রতিমন্ত্রীর দুই সন্তানের নাম বলেও জানা যাচ্ছে। এসব তথ্য যদি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়, তবে তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। কারণ প্রশাসনিক ইউনিটের নামকরণ কোনো ব্যক্তির পারিবারিক পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থানের স্মারক হওয়া উচিত নয়। এসব নাম স্থানীয় ইতিহাস, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বা জনগণের সম্মিলিত পরিচয়ের প্রতিফলন হওয়াই অধিকতর যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য।

ঘটনাটি কেবল একটি নামকরণের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মানসিকতার প্রতিফলন। যখন ক্ষমতা জনগণের সেবার পরিবর্তে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের উপকরণে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে গণমানুষের হাতছাড়া হয়ে পড়ে। প্রশাসনিক কাঠামো কোনো ব্যক্তির পারিবারিক পরিচয় বহনের জন্য নয়; এটি জনগণের সম্মিলিত ইতিহাস ও ভূগোলের প্রতিনিধিত্ব করার কথা। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার এই সংস্কৃতি যদি বিস্তৃত হয়, তাহলে একসময় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলে এবং রাষ্ট্রের চরিত্রও পরিবর্তিত হতে শুরু করে। তখন যোগ্যতা, নীতি ও জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তি-আনুগত্য এবং পারিবারিক প্রভাব গুরুত্ব পেতে থাকে, যা একটি সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলোÑএকটি শ্রেণি দেশের সম্পদ ও ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেদের ভবিষ্যৎ বিদেশে গড়ে তোলে। দেশের অর্থ, সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ এ দেশের সঙ্গে যুক্ত নয়। ফলে রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গাটিও ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। যারা জনগণের টাকায় ক্ষমতার সুবিধা নেয়, অথচ নিজেদের পরিবার ও সম্পদ বিদেশমুখী করে, তাদের কাছে রাষ্ট্র অনেক সময় কেবল ভোগের একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যই বাড়ায় না, বরং শাসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানসিক দূরত্বও সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

এ বাস্তবতায় জনগণের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ একটাইÑরাষ্ট্রকে ব্যক্তি ও পরিবারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে জনগণের মালিকানায় ফিরিয়ে আনা। কারণ রাষ্ট্র কোনো বংশের নয়, কোনো পরিবারের নয়; রাষ্ট্র জনগণের। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রশাসন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার এবং জনগণের সম্পদ দিয়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি এখানেই যে রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি নীতি এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত জবাবদিহি জনগণের কাছেই থাকবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি ক্ষমতার নির্মমতা কত ভয়াবহ হতে পারে। সেই ইতিহাস আমাদের শেখায়Ñ ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ চিরস্থায়ী। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর রাষ্ট্রকে নির্ভরশীল করে তুললে রাষ্ট্র দুর্বল হয়, কিন্তু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে রাষ্ট্র টিকে থাকে। সে ইতিহাস আমাদের শেখায়Ñ ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ চিরস্থায়ী। তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

আজ প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে ব্যক্তিপূজা নয়, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে; পরিবারতন্ত্র নয়, জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো হবে জনস্বার্থভিত্তিক, ব্যক্তিস্বার্থভিত্তিক নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকেও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে, যাতে নেতৃত্বের বিকাশ ব্যক্তি বা পরিবারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। একইসঙ্গে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে হবে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই পারে একটি রাষ্ট্রকে ব্যক্তিনির্ভরতা থেকে মুক্ত করে আইনের শাসনের পথে এগিয়ে নিতে।

রাষ্ট্রকে পরিবারকেন্দ্রিক প্রভাবের হাত থেকে রক্ষা করা এখন শুধু রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি নাগরিক সচেতনতারও অপরিহার্য দাবি। নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা, সুশীল সমাজের সক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার সংস্কৃতিÑ এসবের সমন্বয়েই একটি জনগণমুখী রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে জনগণের হবে, যখন কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠী নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রের অংশীদার হতে পারবে। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়; এটি একটি জাতির সম্মিলিত আমানত, যা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।