পূর্বপ্রকাশিতের পর
এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন যে ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল; একাত্তরে বাংলাদেশ সৃষ্টির পিছনে একই তথ্য বহাল ছিলো। যদি তা না হতো, তাহলে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে বিলীন হয়ে যেত। অখণ্ড ভারত বর্ষে আরও অনেক গুলো ধর্ম বিশ্বাসের মানুষ বসবাস করে। যেমন খ্রিস্টান, বোদ্ধ, জৈন, শিখ প্রবৃতি। কিন্তু কার্যত ইসলামের অনুসারী তথা মুসলিমরা ছাড়া আর সব ধর্মাবলম্বীরাই হিন্দুদের সাথে বিলীন হয়ে গেছে বলা চলে; হিন্দুদের মতো তারাও মূর্তিপূজা করে, দেব-দেবীতে বিশ্বাস করে। কিন্তু মুসলিমরা তা পারেনি। শত শত বছর ধরে প্রতিবেশী হিসেবে একসাথে বসবাস করলেও তাঁদের বিশ্বাস, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি কখনো এক হয় নি। এ ব্যাপারে হিন্দু তথা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের স্বরূপ সম্পর্কে কিছু জানা দরকার। ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদারও ভারতীয় জাতীয়তাবাদরে উত্থান সম্পর্কে লিখতে গিয়ে অনকেটা একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তিনি তার history of freedom movement পুস্তকে বলেছেন, ‘‘...বাংলাদেশে দুটি জাতের মানুষ ছিল, হিন্দু ও মুসলমান। যদিও তারা ছিল একই দেশের বাসিন্দা তবুও এক ভাষা ব্যতীত অন্য সব বিষয়ে তারা ছিল ভিন্ন। ধর্মে, শিক্ষায়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে তারা নয়শ’বছর ধরে বসবাস করেছে যেন দু’টি ভিন্ন পৃথিবী। রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্ন কুমার ঠাকুর প্রভৃতি কলকাতার বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ মুসলমানদের জ্ঞান করতেন হিন্দুদের যত র্দুগতি ও অসম্মানের মূল উৎস হিসেবে -যা হিন্দুরা নয়শ’ বছর ধরে সহ্য করতে বাধ্য হয়ছে।’’
ডঃ মজুমদার আরো বলেছেন যে, ঊনিশ শতকে হিন্দুদের মাঝে উদ্ভূত জাতীয়তাবাদ ছিলো পুরোপুরি হিন্দু মধ্যবিত্তশ্রেণীর একটি ব্যাপক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার ফলে বাঙালি হিন্দুদের অভিজ্ঞতালব্ধ স্বপরিচয়ের এক নব ধারণার প্রকাশ। জাত্যাভিমানের এ বৈশিষ্ট্যই পশ্চিম বাংলার হিন্দুদের পূর্ব বাংলাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে শিখিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, আর রবীন্দ্রনাথই বলুন এরা সকলইে এ বৈশিষ্ট্যরই গর্বিত অংশীদার ছিলেন। পূর্ববঙ্গের মুসলিম বাসিন্দারা তাদের দৃষ্টিতে বাঙালি ছিলেন না। বাঙালি আর ভদ্রলোক বলতে যাদের বুঝাতো তারা হিন্দু, মুসলমানরা নিকৃষ্ট প্রাণী। এজন্যই বঙ্কিম বাবু ১২২৭ বাংলা সালের অগ্রহায়ণের ‘বঙ্গ দর্শনে ‘ লিখেছেন ‘ঢাকাতে দুই চারদিন বাস করিলেই তিনটি বস্তু দর্শকদের নয়ন পথের পথিক হইব। কাক, কুকুর এবং মুসলমান। এ তিনটিই সমভাবে কলহপ্রিয়, অতি দুর্দম, অজয়। বিয়া বাড়িতে কাক আর কুকুর; আদালতে মুসলমান।’ আনন্দ মেঠ তিনি লিখেছেন, ‘ধর্ম গলে, জাতি গলে, কুল গলে, মান গলে, এখন তো প্রাণ পর্যন্তও যায়। এই নড়েদেরে না তাড়ালে আর কি হিন্দুর হিন্দুয়ানী থাকে?
শ্রী বঙ্কমিচন্দ্র চ্যার্টাজীর প্রায় ১০০ বছর পর আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে ‘An eye witness Accounts- এর জন্য এসছেলিনে বাবু শ্রী বসন্ত চ্যাটার্জী ঢাকা নগরী ও তার লোকজনদের দেখেশুনে তিনি প্রশ্ন রেখেছেন :
And the new comer soon finds himself wondering as to what has become of the educated and respectable gentry, those well- dressed people known in Bengali as the bhadraloks, where are the bhadraloks? র্অথাৎ এখানে কোনও নবাগত এসে শিগগিরই অবাক হয়ে ভাববে, শিক্ষিত ও শ্রদ্ধা ভদ্র সমাজের বাংলায় ভদ্রলোক বলে পরচিতি সেই সুবেশী লোকগুলোর কি হল? ভদ্রলোকেরা কোথায়?
ভারতীয় জাতীয়তাবাদের স্বরূপ বস্তুত অতি সাম্প্রদায়িক বর্ণবাদী একটি ধর্মবিশ্বাসেরই অংশ। যারা বিদেশে সফর করেছেন বিদেশী ভারতীয়দের সংস্পর্শে এসেছেন তারা নিশ্চয়ই জানেন যে, ভারতীয়রা বিদেশে গিয়ে বেশির ভাগই ভেজেটেরিয়ান হয়ে যান। এটাও তাদের স্বাতন্ত্রের একটি লক্ষণ। এ ক্ষেত্রে বাংলাভাষী মুসলমানদের যদি তারা ভদ্রলোক মনে না করেন কিংবা তাদের ইতরপ্রাণী কুকুর, কাকের সঙ্গে তুলনা করেন, তাহলে বিস্মৃত হবার কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।
এখানে মূল কথাটা হচ্ছে একটা হিন্দু পরিবার, তার অবস্থান এপারে হোক কিংবা ওপার, কুকুর না যত অস্পৃশ্য তার চেয়ে বেশি অস্পৃশ্য হচ্ছে একজন মুসলমান। ঘরে কুকুর ঢুকলে তাদের ঘর অপবিত্র হয় না কিন্তু মুসলমান ঢুকলে হয়। কেয়ার পাতার নৌকাসহ ভারতীয় টিভি চ্যানেলে প্রচারিত অন্যান্য নাটক সিনেমায় একই ঘরে হিন্দু-মুসলমান বসবাসের যে চিত্র দেখানো হয় তা বাস্তবতা নয়, মিথ্যাচার। আবার এক্ষেত্রে টুপি, দাড়ি ও মাথায় পট্টিধারী মুসলিম চরিত্র মানেই হচ্ছে ক্রিমিনাল, না হয় মধ্যবিত্ত হিন্দুদের কাজের লোক, আশ্রিতা। আর চল্লিশ বছর নিম্নর্বণের সাথে সংসার করে হেশেলে ঢুকতে না দেয়ার বড়াই তো তারাই করতে পারে যাদের প্রতিটি ফোঁটা রক্ত সাম্প্রদায়কিতা এবং বর্ণবাদের দোষে দুষ্ট। আমাকে কেউ কেউ সাম্প্রদায়িক মনে করতে পারেন। কিন্তু এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। সাম্প্রদায়িক শব্দটির যদি র্অথ হয় আপন ধর্ম ও সম্প্রদায়রে প্রতি আনুগত্য এবং ভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের প্রতি সহনশীলতা ও সংযম এবং শ্রদ্ধাবোধ তাহলে আমি অবশ্যই সাম্প্রদায়িক। কিন্তু ভারতীয় সাম্প্রদায়কিতার যে বাস্তব বিষয়টি আমি তুলে ধরেছি তাকে সামনে রাখে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অংশ হয়ে বাংলাদশের মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশের মানুষকে যদি টিকে থাকতে হয় তাহলে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ে ভিত্তিতে টিকে থাকতে হবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বেলায় কতগুলো কঠিন বাস্তবতা রয়েছে। ভারত একটি বড়ো দেশ আবার পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাকে সহয়তা করার একটি বড়াইও করার তার রয়েছে। এছাড়া আছে তার মধ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মোড়লিপোনার অদম্য স্পৃহা। তার এই স্পৃহা ও ইচ্ছামত বাংলাদেশ ও তার সরকার উঠবস করবে; তার নির্দেশনা অনুযায়ী তার স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হবে। দেশটির অর্থনীতিও তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। ভারতের ইচ্ছামতো বাংলাদেশের বন্ধু ও শত্রু রাষ্ট্র নির্ণিত হবে। এক্ষেত্রে আরেকটা কথা না বললে নয়। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতর্বষ বিভক্তি হয়ে পাকিস্তান ও ভারতীয় ইউনিয়নের জন্ম হয়েছিল। তার ২৪ বছর পর পূর্ব পাকিস্তান-পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়। এ সময় অনেকেই বলতে শুরু করেন যে, দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারতা প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ এই তত্ত্বটি ভুল ছিল এবং তার ভিত্তিতে দেশ বিভক্তি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এই গোষ্ঠীটি তখন দেশ বিভক্তির জন্য মরহুম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকেই শুধু দায়ী করনেনি। তারা এ দেশের মুসলিম নেতৃবৃন্দ এবং সম্মানিত আলেম-ওলামা যারা স্বতন্ত্র বাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, তাদের স্বাধীনতার শত্রু হিসেবে চিহ্নত করতে শুরু করলনে। টুপী-দারিধারী নামাজী ব্যক্তিরা নির্যাতনের শিকার হলেন। জিন্নাহর ক্যাপ কুকুরের মাথায় উঠলো এবং ইসলামী মূল্যবোধ, আদব-কায়দা এবং সামগ্রিক আদর্শকে তারা প্রহসনে পরিণত করলেন। এ ধারণার অনুঘটক ছিল তৎকালীন ভারতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় কংগ্রসে পার্লামেন্টারী পার্টি স্বয়ং। তারা ১৩ দিনের সরাসরি যুদ্ধে পাকিস্তানকে হারিয়ে প্রকাশ্যে বাংলাদেশ ভূখণ্ডকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত না করে সিমলা চুক্তি অনুমোদন করতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে অনুমোদন প্রস্তাবে বললেন, “১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতে বাটোয়ারা অবৈধ হয়েছিল। এরপর তাদের এদেশীয় এজন্টেরা এ বাটোয়ারার জন্য দায়ীদের স্বাধীনতার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করলেন। যারা মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা করলেন তাদের সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে সমাজ থেকে নির্মূল করার অভিযান চললো। এ অভিযানকে দার্শনিক ভিত্তি দেয়ার জন্য ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীরও অভাব হলো না। তখন প্রশ্ন দেখা দিলো, যদি ’৪৭ সালের বাটোয়ারা অবধৈ ও বাতিল হয় তাহলে বাংলাদেশ ভারতের সর্ম্পক কি হবে? অখন্ড মানে পুনর্যুক্ত? ভারতের রাষ্ট্রীয় রূপই বা কি দাঁড়াবে হিন্দু-মুসলিম সর্ম্পক কি হবে ইত্যাদিÑ মীমাংসিত প্রশ্নের পুনরুক্তির মত সুদূর প্রসারী প্রশ্ন উঠে আসলো।
সিদ্ধান্তহীনতার এ অবস্থায় স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ শাসনের প্রথম সাড়ে তিন বছর কার্যত, বাংলাদেশ ভারতের আশ্রিত রাজ্যে পর্যবেসিত হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে এর তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তাদের ভারত বিরোধিতা পাকিস্তান আমলকেও ছাড়িয়ে যায় এবং অতিরিক্ত ভারত প্রীতি ও তোষণের জন্য তারা সরকারকেই দোষারোপ করতে শুরু করেন। এর ফল এই দাঁড়ায় যে, শেখ মুজীবের ন্যায় জনপ্রিয় নেতা যখন সপরিবারে নির্মমভাবে নিহিত হলেন তখন তার জন্য আফসোস করার লোক খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপর এ বিষয়টি আর আগায়নি। ভারতীয় শাসনতন্ত্রের আদলে বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে বিধৃত রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র বিদায় নেয়, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস তাতে স্থান পায় এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে শাসনতন্ত্রে ইসলামকে অর্ন্তভুক্ত করা হয়। এটা ছিল গণতান্ত্রিক মূল্যাবোধের প্রতিফলন, দেশের সংখ্যাগুরু মানুষের আকিদা বিশ্বাসের অভিব্যক্তি। এদেশের মানুষের ধর্মীয় পরিচয়কে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ, টিকে থাকতে পারে না। ভারতীয় বুদ্ধিজীবী বসন্ত চ্যাটার্জীও তাই মনে করেন, তার ভাষায় :
Ever since the emergency of Bangladesh even the highest in our Country have been shamelessly claiming that the event has destroyed the two nation, theory. Somebody should ask there hypocrites if they could give one good reason for separate existence
of Bangldesh after the destruction of the two nation theory. If theory has been demolished on they claim, then the only logical consquence should be the reunion of Bangladesh with India as seams to be the positive stand of Bangladeshi Hindus. Could there highly placed people who are all the time drumming the false news of the death of two nation theory, propose that since the theory on the strength of which he had separated in 1947, exists no more, the country had better revert to its old position of sub-servience to Calcutta? (Inside Bangladesh Today pp 150)
অর্থাৎ ‘বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পর থেকে আমাদের দেশের এমনকি সর্বোচ্চ পদধারীরাও নির্লজ্জের মত দাবি করে আসছেন যে, এই ঘটনা দ্বিজাতিতত্ত্ব ধ্বংস করে দিয়েছে। এসব কপটাচারীদদের জিজ্ঞাসা করা উচিৎ দ্বিজাতিতত্ত্ব ধ্বংসের পর বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের একটিও সুযুক্তি তারা দিতে পারেন কিনা। তাদের দাবি অনুযায়ী তত্ত্বটি যদি ধ্বংস হয়ে থাকে তাহলে একমাত্র যুক্তিষিদ্ধ পরিণাম হওয়া উচিৎ, ভারতের সঙ্গে বাংলাদশের পুনঃসংযুক্তি, বাংলাদেশী হিন্দুদের এটাই যথার্থ অবস্থান। এসব উচ্চ পদাসীন ব্যক্তিবর্গ যারা সর্বদা দ্বিজাতিতত্ত্বের মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদের ঢোল পিটাচ্ছেন তারা কি প্রস্তাব দিতে পারেন, ১৯৪৭ সালে যে তত্ত্বের উপর দেশ বিভক্তি হয়েছিল, তার যেহেতু আর অস্তিত্ব নেই, সেহেতু দেশটি কলকাতার অনুগ্রহনির্ভর সেই পূর্বেকার অবস্থায় ফিরে যাওয়াই ভাল?(Inside
Bangladesh Today pp 150) (চলবে)