দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত ও সন্দেহজনক হামের উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৯২ জন শিশু। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৮ জুন পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা ৮০ হাজার ১০৪ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সন্দেহজনক হামে ৫৩৬ শিশু এবং নিশ্চিত হামে ৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ পরিসংখ্যান শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকটের চিত্রই তুলে ধরে না, বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোকেও স্পষ্ট করে।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। কার্যকর টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে এ রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বিশ্বের বহুদেশ হামের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এত বিপুলসংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনা প্রশ্ন তুলছে, আমাদের টিকাদান কর্মসূচি, রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের সংখ্যা যত বাড়বে, সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও তত বাড়বে। প্রত্যন্ত অঞ্চল, দুর্গম চরাঞ্চল, বস্তি এলাকা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদান কার্যক্রমের ঘাটতি থাকলে হামের মতো রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। পাশাপাশি অভিভাবকদের একাংশের মধ্যে টিকা নিয়ে অনীহা, ভুল ধারণা ও গুজবও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল বা ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। প্রতিদিন নতুন আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের ঘরে থাকা প্রমাণ করে যে রোগ সংক্রমণের শৃঙ্খল এখনো ভাঙা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালগুলোতে বিপুলসংখ্যক শিশুর ভর্তি হওয়া স্বাস্থ্যসেবার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। যদিও অনেক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে, তবুও মৃত্যুর ধারাবাহিকতা কোনোভাবেই স্বস্তির খবর নয়। এ পরিস্থিতিতে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে আরও সক্রিয় ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতা বাড়াতে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম, সেসব অঞ্চল চিহ্নিত করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে, যাতে কোনো শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত না হয়।

রোগ শনাক্তকরণ, তথ্য সংগ্রহ ও রিপোর্টিং ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সন্দেহজনক ও নিশ্চিত রোগীর মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে দ্রুত পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং আক্রান্ত এলাকায় তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্য হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা সুবিধা, ওষুধ সরবরাহ এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। শিশুরাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে শত শত শিশুর মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। হামের এমন প্রাদুর্ভাবকে কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি জাতীয় উদ্বেগের বিষয়। সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং অভিভাবক সবাইকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

হামে মৃত্যুর সংখ্যা কোনোভাবেই কমছে না। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই শিশুদের জীবন রক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত, সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।