জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদের ভোটে এবার নজিরবিহীন পরাজয় ঘটেছে জার্মানির। গত কয়েক দশক ধরে প্রতি আট বছর পরপর এই আসনে জয়ী হয়ে আসছিলো জার্মানি। ফলে এবারের পরাজয় দেশটির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক বলে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু এমন পরাজয়ের কারণ কী? বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইলের প্রতি অন্ধ সমর্থন এই পরাজরে মূল কারণ। উল্লেখ্য, গত বুধবার সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে ‘পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য’ গ্রুপের দু’টি আসনের লড়াইয়ে অস্ট্রিয়া ও পর্তুগালের কাছে হেরে যায় জার্মানি। নির্বাচিত হতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ২৩ ভোট কম পেয়ে মাত্র ১০৪ ভোট জোটাতে সক্ষম হয় দেশটি।

নির্বাচনে ভরাডুবির পর জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সরকার নিজ দেশে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। উগ্র ডানপন্থী দল এএফডি পরাজয়কে ‘লজ্জাজনক’ আখ্যা দিয়েছে এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি আন্তর্জাতিক মহলে জার্মানির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এদিকে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ভাদেফুল পরাজয়ের পেছনে ইউক্রেনের প্রতি দৃঢ় সমর্থনের কারণে রাশিয়ার বিরোধিতা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে ইসরাইলের প্রতি জার্মানির বিশেষ ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতাকে দায়ী করেছেন। তবে বিশ্লেষকরা ইউক্রেন ইস্যুর যুক্তিটি নাকচ করে দিয়েছেন। কুইন্সি ইনস্টিটিউর ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রিটা পার্সি স্পষ্টভাবে বলেন, বিজয়ী পুর্তুগাল ও অস্ট্রিয়াও ইউক্রেনকে সমান সমর্থন দেয়। মূলত গাজায় ইসরাইলের জাতিগত নিধনযজ্ঞে বার্লিনের সমর্থন, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদকে অবজ্ঞা করা এবং ইসরাইলি অপরাধের প্রতি অন্ধ সমর্থনের কারণেই বিশ্বমঞ্চে জার্মানি এই শাস্তির মুখোমুখি হয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, জাতিসংঘের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থদাতা দেশ হলো জার্মানি। কিন্তু সরকারের ভুলনীতি জার্মানির ভাবমর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার দপ্তরের সাবেক পরিচালক ক্রেইগ মোখাইবার জার্মানির পরাজয় প্রসঙ্গে বলেন, এটি ‘ন্যায়বিচারের বিরল দৃষ্টান্ত’। তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনে গণহত্যা ও ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে জার্মানির লজ্জাজনক সমর্থন এবং নিজ দেশে মানবাধিকার কর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের ফল এই নজিরবিহীন পরাজয়। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা ইস্যুতে সাধারণ পরিষদের সাতটি প্রস্তাবের চারটিতেই ভোটদানে বিরত ছিল জার্মানি, যার মধ্যে মানবিক যুদ্ধবিরতি এবং ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কর্তৃক যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আসামি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস।

পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, অদূর ভবিষ্যতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা জার্মানির নেই। এমন বক্তব্য থেকে উপলব্ধি করা যায়, ক্রেইগ মোখাইবার নিরাপত্তা পরিষদের ভোটে জার্মানির পরাজয়কে ‘ন্যায়বিচারের বিরল দৃষ্টান্ত’ হিসেবে কেন উল্লেখ করেছেন। আমরা জানি, জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে মানুষের কথা ও কাজ। সাম্প্রতিক সময়ে জার্মান নেতৃবৃন্দ কি এমন মহৎ কাজ করেছেন যে, নিরাপত্তা পরিষদের ভোটে তাদের বিজয় অনিবার্য ছিল? জার্মানি তাদের কথা ও কাজের ফল পেয়েছে। সামনে বিজয় পেতে হলে প্রয়োজন হবে আত্মসমালোচনা এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ। জার্মান নেতৃবৃন্দের তেমন বোধোদয় ঘটে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।