ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ব্যর্থতার জবাবদিহি সরকারকেই করতে হবে। টাঙ্গাইলে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে সহযোগিতা প্রদানকালে নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ঈদের একেবারে কাছাকাছি সময়ে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনাটি ঘটলেও যোগাযোগজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয়নি বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে ঘটনার পরপরই তিনি নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের পক্ষ থেকে যত দ্রুত সম্ভব তাদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সকলেই ছিলেন শ্রমজীবী মানুষ। তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের নৈতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব। তিনি মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করে বলেন, আল্লাহ যেন নিহতদের শহীদ হিসেবে কবুল করেন, তাদের সকল গুনাহ মাফ করে দেন এবং জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন।
ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, স্বজন হারানোর বেদনা পৃথিবীর অন্যতম কঠিন বাস্তবতা। যে শিশু তার বাবাকে হারিয়েছে, সে আর কখনো বাবার স্নেহ ও মমতা পাবে না। যে মা তার সন্তানকে হারিয়েছেন, তিনি আর সন্তানের স্নেহভরা ডাক শুনতে পাবেন না। আর যে স্ত্রী স্বামীকে হারিয়েছেন, তাকে নতুন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি শোকাহত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে মহান আল্লাহর কাছে তাদের জন্য ধৈর্য ও শক্তি কামনা করেন।
তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে ঈদের মতো আনন্দের সময়েও দেশের সড়কপথ সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠতে পারেনি। গত রমজানের ঈদে অসংখ্য মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হলেও ঈদুল আজহাতেও বহু মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতার কারণে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, স্বল্প আয় এবং উৎসবকেন্দ্রিক অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অনেক শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহনে যাতায়াত করতে বাধ্য হন। বিশেষ করে গার্মেন্টসহ বিভিন্ন খাতে কর্মরত শ্রমিকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হন। ভাড়া বৃদ্ধি না করে বরং উৎসবের সময় জনগণের যাতায়াত সহজ ও নিরাপদ করতে রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের সড়কপথে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, নিহতদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এমন একজন শ্রমিকের মৃত্যুর ফলে অসুস্থ বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকারি বরাদ্দ জনগণের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, বাসস্থান, চিকিৎসা ও জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
তিনি স্থানীয় এমপির উদ্দেশে বলেন, “আমরা জানি ইতোমধ্যে আপনি অনেক বরাদ্দ পেয়েছেন। যদি আপনি জনবান্ধব এমপি হয়ে থাকেন, তাহলে এসে তাদের খোঁজখবর নিন। তারা যেন তাদের জীবন চালিয়ে যেতে পারে, তাদের ঘর না থাকলে ঘর করার ব্যবস্থা করে দিন। এই পরিবারগুলোর পূর্ণ ভরণপোষণের দায়িত্ব আপনি নেবেন। যিনি এমপি, তাকেই এ দায়িত্ব নিতে হবে। এমপি সাহেবের রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ হবে জনগণের জন্য। রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ দিয়ে পকেট ভরার কোনো সুযোগ নেই। আমরা আশা করব, এই মান্দা এলাকার দায়িত্ব নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন যে আপনি জনগণের বন্ধু। জনগণের সত্যিকারের বন্ধু না হয়ে কথার ঝুলি চালিয়ে কোনো লাভ নেই।”
তিনি বিভিন্ন সামাজিক, মানবিক ও দাতব্য সংস্থার প্রতিও আহ্বান জানিয়ে বলেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করবে। তিনি স্বীকার করেন, সংগঠনের সামর্থ্য সীমিত হলেও শ্রমিকদের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা থেকেই তারা শোকাহত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নিতে এসেছেন। ভবিষ্যতে সুযোগ হলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বাড়িতে গিয়ে তাদের অবস্থা জানার এবং সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন।
নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটিতে অনুষ্ঠিত “২৫ মে ভোরে টাঙ্গাইলে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায়” নিহত ১০ পরিবারের সদস্য ও আহত ৫ পরিবারের মাঝে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান অনুষ্ঠান ৪ জুন, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হয়।
এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা জামায়াত আমির খন্দকার মো. আব্দুর রাকিব, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানী, কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সবুর এবং নওগাঁ জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি মো. নাসির উদ্দিন প্রমুখ।