ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয় ইতিহাস বেঁচে থাকে স্থাপনা, নিদর্শন ও স্মৃতিচিহ্নের মধ্যেও| এসব নিদর্শন একটি অঞ্চলের অতীত, ঐতিহ্য ও সভ্যতার ধারক-বাহক হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসকে পৌঁছে দেয়| কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশের বহু ঐতিহাসিক স্থাপনার মতো যশোরের প্রায় ২২৪ বছরের পুরোনো সূর্যঘড়িটিও আজ অবহেলা ও অযত্নের শিকার|

যশোর জেলা রেজিস্ট্রি অফিস প্রাঙ্গণে অবস্থিত এই সূর্যঘড়ি নির্মিত হয়েছিল ১৮০২ সালে| ব্রিটিশ শাসনামলে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে তৎকালীন কালেক্টর মিস্টার রোক এটি স্থাপন করেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়| সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী সময় নির্ধারণের এই প্রাচীন ˆবজ্ঞানিক যন্ত্রটি শুধু একটি ঘড়িই নয়, বরং উপমহাদেশে প্রশাসনিক আধুনিকতার প্রাথমিক অধ্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক|

ঐতিহাসিকভাবে যশোর বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা| ১৭৮১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যশোরকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করে| পরবর্তীতে ১৭৮৬ সালের ৫ এপ্রিল পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে যশোর কালেক্টরেটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়| প্রথমে মুড়লী এলাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও ১৮০১ সালে বর্তমান যশোর শহরের কসবা এলাকায় স্থায়ী কালেক্টরেট ভবন নির্মাণ করা হয়| সূর্যঘড়িটি নির্মিত হয়েছিল সেই কালেক্টরেট ভবনের পশ্চিম পাশেই|

এই কালেক্টরেট ভবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের মহীরুহ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিও| ১৮৫৮ সালের ২৩ আগস্ট তিনি ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং যশোরে দায়িত্ব পালনকালে এই কালেক্টরেট ভবনেই তাঁর দপ্তর ছিল| ফলে ভবনটি যেমন প্রশাসনিক ইতিহাসের অংশ, তেমনি বাংলা সাহিত্য-ইতিহাসেরও মূল্যবান স্মারক|

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আজ সেই ঐতিহ্যবাহী কালেক্টরেট ভবন জরাজীর্ণ না হলেও পরিত্যক্ত অবস্থা রয়েছে সূর্যঘড়িটি| যশোরের দলিল লেখকদের টিনশেড, অস্থায়ী স্থাপনা এবং নানা অব্যবস্থাপনার কারণে ঐতিহাসিক নিদর্শনটি প্রায় আড়াল হয়ে গেছে| যে সূর্যের আলোয় সময়ের হিসাব দিত এই ঘড়ি, আজ যুগের পর যুগ পার হলেও সেই সূর্যের আলো তার গায়ে পড়ে না|

স্থানীয় ইতিহাস গবেষক ও প্রবীণ শিক্ষক আবুল হাশেম রেজা বলেন, যশোরের সূর্যঘড়িটি শুধু জেলার নয়, দেশেরও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য| এটি সংরক্ষণ করা গেলে শিক্ষার্থী, গবেষক ও পর্যটকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান হতে পারে|

যশোরের অ্যাডভোকেট আব্দুল লতিফ বলেন ,আমরা প্রায়ই উন্নয়নের কথা বলি, কিন্তু ইতিহাস সংরক্ষণও উন্নয়নের একটি অংশ| একটি জাতি তার শিকড় ভুলে গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পরিচয় সংকটে পড়ে| তাই সূর্যঘড়ি দ্রুত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন|

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক খন্দকার রাশিদুজ্জামান রতন বলেন , দেশের বিভিন্ন স্থানে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে| যশোরের এই সূর্যঘড়িও যথাযথভাবে সংস্কার ও পরিচর্যা করা হলে জেলার ঐতিহ্য তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে|

যশোর জেলা দলিল লেখক সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য খাইরুজ্জামান সাগর বলেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না যশোরে এত পুরোনো একটি সূর্যঘড়ি রয়েছে| এটি আড়ালে পড়ে থাকায় মানুষের নজরে আসে না| সরকার সংরক্ষণে উদ্যোগ নিলে দলিল লেখক সমিতি সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে, প্রয়োজন হলে জায়গা ছাড়তেও আপত্তি নেই|

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণে শুধু সংস্কার করলেই হবে না প্রয়োজন সঠিক নথিভুক্তকরণ, তথ্যফলক স্থাপন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা| সূর্যঘড়ির চারপাশ দখলমুক্ত করে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এর পুনরুদ্ধার করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে|

যশোরবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে| প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং সংস্কৃতিবিষয়ক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সমšি^ত উদ্যোগ গ্রহণ করলে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহাসিক সম্পদ নতুন জীবন পেতে পারে|

ইতিহাসের আলোয় আলোকিত হওয়ার কথা ছিল যে সূর্যঘড়ির, সেটি আজ অবহেলার ছায়ায় ঢাকা| সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই ২২৩ বছরের নিদর্শন যেন মানুষের উদাসীনতায় কালের গহ্বরে হারিয়ে না যায়| যশোরের ঐতিহ্য ও গৌরব রক্ষায় এখনই প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ| কারণ ইতিহাস হারিয়ে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না কিন্তু সংরক্ষণ করা গেলে তা হয়ে ওঠে একটি জাতির অহংকারের অলংকার|###