কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহুল প্রতীক্ষিত জরুরি বিভাগের কার্যক্রম আগামী ৩০ জুলাই থেকে পূর্ণাঙ্গরূপে চালুর ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই সংবাদে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন কুষ্টিয়াসহ আশপাশের কয়েক জেলার সাধারণ মানুষ। এখন থেকে জটিল চিকিৎসা বা আকস্মিক জরুরি মুহূর্তে রাজশাহী, ঢাকা কিংবা খুলনায় ছুটতে হবে না; নিজ এলাকাতেই মিলবে পূর্ণাঙ্গ জরুরি স্বাস্থ্যসেবা।
শনিবার দুপুরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কনফারেন্স রুমে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মুক্ত ও প্রাণবন্ত মতবিনিময়কালে এই তথ্য নিশ্চিত করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান।
মতবিনিময়কালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও শতভাগ অটোমেশনের মাধ্যমে জেলাটিকে পুরো খুলনা বিভাগের প্রধান ‘হেলথ হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, হাসপাতালে থাকা সেনাক্যাম্প সরিয়ে নেওয়ায় এর পুরো অবকাঠামো এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে। ৩০ জুলাই জরুরি বিভাগ চালুর পর আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে ১৫টি অপারেশন থিয়েটার (OT) সচল করে ইনডোর ও আউটডোর সেবা বহুগুণ বাড়ানো হবে।
কঠোর নজরদারির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তদারকি জোরদার করার কারণে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে রাজস্ব আয় বেড়ে বর্তমানে ৮-১০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। শতভাগ অটোমেশন ও ডিজিটাল বিলিং চালু হলে রাজস্ব আয় মাসে ৩০ লাখ টাকা ছাড়াবে। সরকারি ফি আত্মসাৎ বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
দালালচক্র রুখতে চিকিৎসকদের জবাবদিহিতা ও কঠোর মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, দেশব্যাপী চিকিৎসক সংকট কাটাতে ৫ হাজার এমবিবিএস ডাক্তার, ৩০০ ডেন্টাল সার্জন এবং ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া প্রাক-প্রাথমিক ও গ্রামীণ পর্যায়ে রোগীদের সেবা ট্র্যাকিংয়ের জন্য খুব শিগগিরই ‘ডিজিটাল হেলথ কার্ড’ চালু করা হবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আকুল উদ্দিন, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম, জেলা সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন এবং ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর কুষ্টিয়া জেলার নেতা ডা. নাসিমুল বারী বাপ্পীসহ স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ।
উল্লেখ্য যে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৭৫ কোটি টাকা প্রাক্কলন ব্যয় ধরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। কুষ্টিয়া শহরের কালীশংকরপুর মৌজায় ২০ একর জমিতে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়। বিভিন্ন সময়ে ৫৩টি প্যাকেজে ৫২ জন ঠিকাদার কাজটি করতে থাকেন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও শেষ হয়নি।
তখন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ২০১৮ সাল পর্যন্ত নানা জটিলতায় কাজ বন্ধ থাকে। ২০১৮ সালে প্রথম দফায় কাজের মেয়াদ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। নির্মাণের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬১১ কোটি টাকা। কিন্তু এ সময়েও কাজ শেষ করতে পারেননি ঠিকাদারেরা। দ্বিতীয় দফায় ২০২১ সালের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। এবার ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮২ কোটি টাকা, যা প্রথমে ধরা ব্যয় থেকে ৪০৭ কোটি টাকা বেশি। ওই মেয়াদেও কাজ শেষ না হওয়ায় তৃতীয়বারের মতো ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়িয়ে কাজ শেষ হয়।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সাততলা ভবনে ৫০০ শয্যার পাশাপাশি ৮৮টি কেবিন, ২৩ শয্যার সিসিইউ, ২০ শয্যার আইসিইউ সেবা আছে। এ ছাড়া জরুরি সেবা দিতে আলাদা আরও ১৩০ শয্যার ব্যবস্থা আছে।
এদিকে হাসপাতালের জন্য ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুনে অন্তত ৯০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও আসবাব কেনা হয়। যা বর্তমানে হাসপাতালের ভবনের ভেতরে পড়ে আছে।
অনেক নাটকীয়তা বাধা-বিপত্তির পর অবশেষে ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আন্তঃবিভাগে রোগী ভর্তি শুরু হয়।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দীর্ঘ ১৬ বছরের দুর্নীতিতে এখনও ধুঁকছে। নানা সংকটে বৃহৎ এ চিকিৎসালয়ে কোনো সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। প্রকল্পের শুরু থেকেই নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি হাসপাতালটি। বাজেট ও জনবল সংকট মাথায় নিয়ে এবং যন্ত্রাংশ হস্তান্তর ছাড়াই দীর্ঘ এক যুগ পর ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে হাসপাতালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
ইতিপূর্বে ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর হাসপাতাল ভবনের একটি অংশে আংশিক বহির্বিভাগ চালু হয়। কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফের নির্দেশে এটি চালু করা হয়। তবে বর্তমানে হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলছেন, সেটা অবৈধভাবে কোনো অনুমোদন ছাড়াই করা হয়েছিল।
হাসপাতালটি চালু হলেও জনবল সংকটের কারণে কার্যক্রম নেই জরুরি বিভাগে। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার জনবলের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৯৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এত সংকটের কারণে ২৩ বিভাগের মধ্যে চালু করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ছয়টি বিভাগ।
হাসপাতালের তথ্য মতে, ৫০০ বেডের হাসপাতালে এখনও অর্ধেক কার্যক্রমও শুরু হয়নি। ২৩ বিভাগের বিপরীতে চালু হয়েছে মাত্র ছয় বিভাগ।
অন্যদিকে জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘদিনেও হাসপাতালটি পুরোপুরি চালু হয়নি। জনবল ছাড়া পূর্ণাঙ্গরূপে হাসপাতাল চালু করা প্রায় অসম্ভব।
অভিযোগ রয়েছে, যেসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে তার অনেকগুলোর প্রকৃত দর বাজারমূল্যের তুলনায় বহুগুণ বেশি দেখানো হয়েছে। কিছু যন্ত্রপাতি ব্যবহারের উপযোগী নয়। এমনকি কোনো ব্র্যান্ডের লোগো নেই এমন কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়েছে। এতে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি চালু হলেও রোগীর সবরকম টেস্ট বা পরীক্ষা এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে আলট্রাসোনো, এক্স-রে ও ইসিজি পরীক্ষা শুরু করা হয়েছে। তবে সিটিস্ক্যান বা এমআরআই’র মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এখনো চালু হয়নি।
মেডিকেল কলেজ সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে (কুষ্টিয়া শহরে ম্যাটস ক্যাম্পাস) কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। মূল ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয় ২০২২ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে। সেখানে ছয়তলা একাডেমিক ভবন, চারতলা করে দুটি হোস্টেল ভবন, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য তিন ও দোতলাবিশিষ্ট ডরমিটরি, মসজিদ এরই মধ্যে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে মেডিকেল কলেজের হাসপাতাল চালু না হওয়ায় ক্যাম্পাস থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্লিনিক্যাল ক্লাস করেন। শিক্ষার্থীরা দুটি ভাড়া বাসে যাতায়াত করেন।
গত বছরের ১০ জুলাই ও চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ওই মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গরূপে চালুর দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। মেডিকেল কলেজের হাসপাতাল চালু না হওয়ায় সেখানকার শিক্ষার্থী, রোগীসহ সাধারণ মানুষের ব্যাপক অসুবিধা হচ্ছে বলে আন্দোলন করা হয়।
কুষ্টিয়ার সাবেক জেলা প্রশাসক ইকবাল হোসেন, সদর আসনের এমপি মুফতি আমীর হামজাসহ দলের নেতৃবৃন্দ কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি চালুর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করেন। কিন্তু পাহাড়সম বাঁধায় তা আটকে যান। সব প্রতিকূলতাকে মাড়িয়ে অবশেষে পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হচ্ছে হাসপাতালটি।
সবমিলিয়ে বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটির জরুরি বিভাগ চালু হতে চলেছে। পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হলে রোগীরা ভালো সেবা পাবেন বলে অভিমত প্রকাশ করেন কুষ্টিয়ার সুশীল সমাজ।