নবীগণ মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। তাঁরা সদা নিষ্পাপ, এতে কোন সন্দেহ নেই। ঠিক তেমনি করে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবীগনের আদালত বা ন্যায়পরায়নতার নীতি ধারণ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ঈমানের দাবি ও দ্বীনের স্বার্থে জামায়াত উলামায়ে কেরামের ঐক্য সমুন্নত রাখতে চায়।

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র কাটাবন সেন্টারে আজ শনিবার (১৮ জুলাই) সকালে উলামা বিভাগ ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে আয়োজিত দেশবরেণ্য আলেমদের সমন্বয়ে “ইসমতে আম্বিয়া ও আদালতে সাহাবা” শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি মাওলানা আব্দুল হালিম প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।

কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সদস্য মুফতি ড. আবুল কালাম আজাদ বাশারের সভাপতিত্বে এবং ড. মুহাদ্দিস মাহমুদুল হাসান ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আজহারীর পরিচালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম এর কুরআনিক সায়েন্স এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. বি.এম. মফিজুর রহমান আল-আজহারী।

ড. আজহারী তার ১৭ পৃষ্ঠার প্রবন্ধে বলেন, মানব জাতির মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন নবী আলাইহিমুস সালামগণ। তিনি ইসমাতে আম্বীয়া ও আদালাতে সাহাবা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। প্রবন্ধে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসমাতে আম্বিয়া ও সাহাবীদের পরিচয় বিশদভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইসমাহ বা নিষ্পাপত্ব হলো রাসূল ও নবীদের অপরিহার্য গুণাবলীর অন্যতম আবশ্যিক শর্ত। যা নবুয়্যতের পদমর্যাদার একটি অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। যার মধ্যে সকল পূণ্যগুণের সমাহার ঘটে। যা নবী-রাসুলদেরকে বড় বড় পাপ থেকে রক্ষা করে ও ইচ্ছাকৃত ছোট পাপ থেকে তাঁদেরকে আড়ালে রাখে। অন্যদিকে, নবীদের শিক্ষা ও জীবনাদর্শ যাদের মাধ্যমে মানবতার কাছে নির্ভুল পন্থায় পৌঁছায়, তারা হচ্ছেন তাদের নিবেদিতপ্রাণ সাথীগণ। আমাদের ক্ষেত্রে তারা হলেন, আসহাবু রাসূলুল্লাহ সা.। যাদের চারিত্রিক সততা ছিলো প্রশ্নাতীত। নির্ভরযোগ্য, বিশ্বস্ততা, ব্যক্তিত্ব, ন্যায়পরায়নতা ও গ্রহণযোগ্যতার মানদন্ডে নবিদের পরেই তাদের অবস্থান। তারা মানবজাতির শ্রেষ্ঠসন্তান। অথচ তাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করার নানামুখী ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলছে যা ইসলামের মূলভিত্তিতে আঘাত হানছে।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত আলেম মুহাদ্দিস মাওলানা ইসমাইল হোসেন, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা ঢাকার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. খলিলুর রহমান মাদানী, প্রফেসর আ ন ম রশিদ আহমদ আল-মাদানী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার প্রফেসর ড. অলিউল্লাহ, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা টংগী গাজীপুরের অধ্যক্ষ ড. হেফজুর রহমান, ড. মুতিউল ইসলাম আল-মাদানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. ইউসুফ বিন হুসাইন, অধ্যক্ষ মাওলানা মোশাররফ হোসাঈন, মুফতি আলী হাসান ওসামা, ড. মীম আতিকুল্লাহ, মাওলানা আ ন ম হেলাল উদ্দিন, মাওলানা হাবিবুল্লাহ মোহাম্মদ ইকবাল।

এছাড়াও বক্তব্য রাখেন মাওলানা ফখরুদ্দিন আহমেদ, মাওলানা সাদিকুর রহমান আজহারী, মুফতি আহমাদ শরীফ, ড. জাকারিয়া নূর, প্রফেসর সাদেক মোঃ ইয়াকুব আল-আজহারী, মুফতি মহিউদ্দিন, শায়েখ জামাল উদ্দিন, মাওলানা আনম মইনুদ্দিন সিরাজী, মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালি, মুফতি কামাল উদ্দিন, মুফতি গোলাম কবির আজহারী, মাওলানা জালাল উদ্দিন, মাওলানা ইমদাদুল্লাহসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম।

প্রধান অতিথি তার বক্তব্যে বলেন, জাতীয় ঐক্যে আলেমদের কোন বিকল্প নাই। যুগের পরে যুগ জাতীয় ঐক্য ধরে রাখতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অনেক ত্যাগ ও কোরবানীর পরিচয় দিয়েছে। যারা আলেমদের নিয়ে শানে সাহাবা সভার নামে মানুষ জবাইয়ের হুংকার দেয়, আমরা তার প্রতিবাদ জানাই। শানে রিসালাতের নামে সম্মেলন করে আমাদের বিরুদ্ধে নেগেটিভ প্রচারণা চালানো হয়, অথচ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শানে রাসুলের সিরাতুন্নবী সা. অনুষ্ঠান করতে গিয়ে আমাদের ভাইয়েরা জুলুমের শিকার হয়েছেন, কেউ কেউ পঙ্গুত্বও বরণ করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি নবীগণ আল্লাহর নির্দেশিত বিধানসমূহ যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়েছেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নবীগণ সকল ভুলত্রুটি থেকে মুক্ত, তাঁরা আল্লাহর ওহীর মাধ্যমে পরিচালিত ও আমানতদার। অন্যদিকে সাহাবাগণ সততা, ন্যায়পরায়নতা, আমানতদারিতার সাথে শতভাগ দায়িত্ব পালন করেছেন। আল্লাহ ও তাঁর রসুল সা. তাদেরকে ভালোবেসেছেন। আমরাও তাঁদের কে ভালোবাসি, অনুসরন করি।

তিনি আরও বলেন, আমরা জামায়াতে ইসলামীকে নয়, বরং এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চাই। অথচ একটি মহল জামায়াতের কাপড় খুলে ফেলতে চায়। মনে রাখতে হবে, আমাদের অসংখ্য নেতারা বছরের পর বছর কারাবরণ করেছেন, অসংখ্য নেতা ফাঁসির দড়ি হাঁসিমুখে বরণ করে নিয়েছেন, গুম হয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, তবুও কারো কাছে সামান্য কোন কিছুর বিনিময়ে আপোষ করেনি, আমরাও করবো না ইনশাআল্লাহ। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এই জমিনে আল্লাহর দিন কায়েমের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আলেমদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আগামীর সংসদ ইসলামপন্থীদের সংসদে পরিণত হবে, ইনশাআল্লাহ।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মুহাদ্দিস মাওলানা ইসমাইল হোসেন বলেন, মাওলানা মওদুদী রহ. এর উপর অনেকে সাহাবী বিদ্বেষী হিসেবে মিথ্যা অপবাদ দেয়। অথচ তার কোনো কিতাবে বা লেখনিতে সাহাবী বিদ্বেষমুলক একটা শব্দও নেই। তিনি বিশ্বজুড়ে ইসলামী রাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজনীতিসহ আধুনিক ও সমসাময়িক বিষয়ের গভীর জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে সকলের কাছে সমাদৃত।

ড. খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, আমরা যুগের পর যুগ আলেমদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য, সম্প্রীতি ও অন্যায়ের মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ থাকার সার্বিক প্রচেষ্টা করেছি। যার ফলশ্রুতিতে আজ বাংলাদেশে নতুন একটি সমাজ বিনির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। আলেমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে আগামীর বাংলাদেশ ইসলামের বাংলাদেশ হবে ইনশাআল্লাহ।

সভাপতির বক্তব্যে ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার বলেন, ইসমাতে আম্বিয়া ও আদালাতে সাহাবা শীর্ষক সেমিনার এই প্রথম। যা জাতির কাছে প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে ইনশাআল্লাহ, কেননা আজ বরেণ্য উলামায়ে কেরামের বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে যে আমাদের উপর দেয়া সাহাবী বিদ্বেষী অপবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

অনুষ্ঠানে দেড় শতাধিক বরেণ্য মুফাসসিরে কুরআন ও ইসলামী চিন্তাবিদ উপস্থিত ছিলেন।