প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী

ঈমান, কুফর, ইসলাম, শিরক, নেফাক, ফিসক-এমন কতিপয় পরিভাষা সম্পর্কে আমরা মোটামুটি সকলেই পরিচিত। মুসলমানের ঘরে জন্ম নেয়া একজন ব্যক্তিকে কাফের, মুনাফিক বা নাস্তিক বললে সে ক্ষেপে উঠবে এবং ক্ষেপে উঠাটাই স্বাভাবিক। কারণ তার কপালে এমন কোনো শব্দ লেখা নেই বা সে নিজে সরাসরি অস্বীকারও করেনি। জন্মসূত্রে বা কালিমা তাইয়্যেবাহ উচ্চারণের মাধ্যমে কেহ মুসলমান হলে আল্লাহপাক নিজে বা তাঁর রসুল মুহাম্মদ (সা.) ব্যতিক্রম ছাড়া কাউকে কাফের, মুশরিক বা মুনাফিক বলে চিহ্নিত করেননি। বরং কারো সম্পর্কে এমন কিছু বলার ব্যাপারে রসুল (সা.) সতর্ক করেছেন। ফিকাহ শাস্ত্রের দৃষ্টিতে এটিই যথার্থ। ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম মানি বা না মানি আমাদের আদমশুমারি বা ভোটার তালিকায় নাম ঠিকই মুসলমান হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে বা থাকবে। আমাদের আদমশুমারি বা ভোটার তালিকায় নাম থাকার সাথে সাথে আল্লাহপাকের একটি নিজস্ব দপ্তর রয়েছে। সেখানে পরিচয় নির্ধারণ করা হয় নির্ভেজাল ঈমান ও আমলের ভিত্তিতে। মুসলমান হিসেবে আমরা সবাই আখেরাতে বিশ্বাস করি এবং মৃত্যুর পরে সেই আখেরাতে জাহান্নামের পরিবর্তে আমরা সবাই জান্নাতের প্রত্যাশী। আল্লাহপাক নানাভাবে জান্নাতের বর্ণনা দিয়েছেন। সাধারণত ঈমান ও নেক আমলের বিনিময়ে তিনি তাঁর বান্দাদের জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন।

মুসলমান হওয়ার জন্য ঈমান শর্ত। গায়েবের প্রতি ঈমান- না দেখে এবং কোনো যুক্তিবুদ্ধি ছাড়াই ঈমান আনা মুসলমান হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্ত। আল্লাহ, রসুল, আখেরাত, কিতাব, তকদির- এগুলো জেনেবুঝে ঈমান নয় বরং এগুলোর প্রতি বিশ্বাস এনেই একজন ব্যক্তি ইসলামের সীমার মধ্যে প্রবেশ করে। মানুষের হেদায়াতের জন্য আল্লাহপাকের সর্বশেষ কিতাব হলো আল কুরআন। এই কুরআন যদিও সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়াত (বাকারা ১৮৫) কিন্তু এই কুরআন থেকেই কেবল তারাই হেদায়াত পাবে যাদের মধ্যে রয়েছে তাকওয়া এবং যারা গায়েবের প্রতি বিশ্বাস করে, নামায কায়েম করে, আল্লাহর দেয়া রিজিক থেকে ব্যয় করে, কিতাবের প্রতি বিশ্বাস করে ও আখেরাতের প্রতি একিন রাখে (সূরা বাকারা (১-৪)।

এই দুনিয়াটা কর্মক্ষেত্র এবং আখেরাত হলো ফলভোগের জায়গা। আল্লাহকে তাঁর সকল গুণাবলীসহ বিশ্বাস, মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বশেষ নবী ও রসূল, কুরআনকে তাঁর উপর সর্বশেষ নাজিলকৃত কিতাব ও জীবযাপনের একমাত্র বিধান, আখেরাতের উপর দৃঢ় বিশ্বাস ও তকদিরের ফায়সালা মেনে নেয়ার সমষ্টি হলো ঈমান এবং শর্তহীনভাবে যারা মেনে নেয় তাদেরই নাম মুমিন। ঈমানের দাবি অনুসারে যারা নেক আমল করে এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকে তারাই হলো মুসলিম। ইসলাম অর্থ মেনে নেয়া বা নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে দেয়া এবং কোনো প্রশ্ন ছাড়াই যারা আল্লাহকে মেনে নেয় বা ইসলাম মেনে নেয় তারাই মুসলিম অর্থাৎ আত্মসমর্পণকারী। তাদের একই কথা, ‘আমরা নির্দেশ শুনেছি ও অনুগত হয়েছি’- সূরা বাকারা ২৮৫। আল্লাহপাক তাঁর বান্দাদের জীবনবিধান হিসেবে দান করেছেন ইসলাম। তাঁর বাণী, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মনোনীত একমাত্র দীন হলো ইসলাম’- সূরা আলে ইমরান ১৯। খণ্ডিতভাবে মানার কোনো সুযোগ আল্লাহপাক রাখেননি। তাঁর বাণী, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণ ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’- সূরা বাকারা ২০৮। ইসলামকে যারা ব্যক্তিজীবনে মেনে চলে অথচ রাষ্ট্রজীবনে নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করে তারা শয়তানের দোসর। এদের পরিণতি বড়ো ভয়াবহ। আল্লাহপাকের সতর্কবাণী, ‘তোমরা কি দ্বীনের কিছু অংশ মানবে এবং কিছু অংশ অমান্য করবে, তাহলে দুনিয়ার জীবনে রয়েছে জিল্লতি ও আখিরাতে রয়েছে ভয়াবহ আজাব’- সূরা বাকারা ৮৫।

ইসলাম অর্থ যেমন মেনে নেয়া, আনুগত্য করা ঠিক বিপরীত কুফর অর্থ অমান্য করা, অস্বীকার করা। সূরা মায়েদায় আল্লাহর বিধান অমান্য করাকে কুফর, জুলুম ও ফিসক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর দেয়া বিধান অনুসারে যারা ফায়সালা করেনা তারা কাফির (সূরা মায়েদাহ ৪৪), আল্লাহর দেয়া বিধান অনুসারে যারা ফায়সালা করেনা তারা জালেম (সূরা মায়েদাহ ৪৫), আল্লাহর দেয়া বিধান অনুসারে যারা ফায়সালা করেনা তারা ফাসেক (সূরা মায়েদাহ ৪৬)। একজন মুসলমান তার জীবনের সকল বিষয়ের ফয়সালা করবে আল্লাহর দেয়া নিয়মানুসারে এবং সেটি যদি না করে তাহলে সে অমান্য (কুফরি) করলো অর্থাৎ কাফের। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর দেয়া নিয়মের মধ্যে রয়েছে ন্যায় ও ইনসাফ। ফলে কেহ যদি আল্লাহর দেয়া নিয়মানুসারে ফয়সালা না করে তাহলে জুলুম করা হলো অর্থাৎ সে একজন জালেম। তৃতীয়ত, বান্দা হিসেবে আল্লাহর বিধানের আনুগত্য না করা অবাধ্যতা বা ফাসেকি অর্থাৎ সে একজন ফাসেক।

আল্লাহর কাছে বংশ, ভাষা, দেশ, বর্ণ, লিঙ্গ কোনো মূল্য বহন করে না (মাত্র পরিচিতি) বরং আল্লাহর কাছে মূল্য বহন করে তাঁকে ভয় করে চলার মধ্যে। তাঁর বাণী, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মাঝে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাবান যে মুত্তাকি’- সূরা হুজুরাত ১৩। যার মধ্যে আল্লাহর ভয় রয়েছে তার দ্বারা আল্লাহর হক এবং বান্দার হক নষ্ট করা সম্ভব নয়। বান্দার মাঝে আল্লাহর ভয়টা আসে ঈমানের পরিপক্কতার উপর। ঈমানের সাথে আমলের সম্পর্কটা অবিচ্ছেদ্য। বীজ ও বৃক্ষের মাঝে যেমন সম্পর্ক তেমনই। জমিনে বীজ বপন করা হলে সেখানে চারা গজায় এবং এটিই স্বাভাবিক। যদি চারা না গজায় তাহলে বোঝা যাবে বীজটা পচা বা কোনো পাথরখণ্ডের নিচে চাপা পড়েছে বা কোনো অনুকূল পরিবেশ পায়নি। একজন মুসলিম দাবিদার ব্যক্তি যদি নামায না পড়ে বা আল্লাহপাকের ফরজ বিধান লঙ্ঘন করে তাহলে বোঝা যাবে তার মাঝে ঈমান নেই। একজন ব্যক্তির ঈমান আনার সাথে সাথে তার প্রথম ও প্রধান করণীয় হলো নামায আদায়। আল্লাহর বাণী, ‘সবর ও নামায সহকারে সাহায্য চাও। নিঃসন্দেহে নামায বড়ই কঠিন কাজ, কিন্তু সেসব অনুগত বান্দাদের জন্য কঠিন নয় যারা মনে করে, সবশেষে তাদের মিলিত হতে হবে তাদের রবের সাথে এবং তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে’- সূরা বাকারা ৪৫-৪৬। আখেরাতে বিশ্বাসী কোনো ব্যক্তি কখনই নামাযে উদাসীন হতে পারে না। সরাসরি জাহান্নামে যাওয়ার কারণসমূহের মধ্যে নামায আদায় না করা একটি বড়ো কারণ। আল্লাহপাকের বাণী, ‘কোন্ জিনিস তোমাদের জাহান্নামে নিয়ে আসলো? তারা বলবে, আমরা মুসল্লিদের দলভুক্ত ছিলাম না, আমরা মিসকিনদের খাবার দিতাম না, মিথ্যা রটনাকারীদের সাথে মিথ্যা রটনা করতাম ও প্রতিফল দিবসকে মিথ্যা মনে করতাম’- সূরা মুদ্দাস্সির ৪২-৪৬। ঈমান ও কুফরের মাঝে পার্থক্যকারী বিষয় হলো নামায। নামায সূচনা থেকেই ফরজ ছিল কিন্তু জামাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায হিজরতের পরে ফরজ হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে কেহ নামাযের জামাতে অনুপস্থিত থাকতে পারতো না। কেহ অনুপস্থিত থাকলে বলা হতো, সে মুরতাদ হয়ে গেছে। মুনাফিকরা বাধ্য হতো জামাতে হাজির হতে। মুনাফিকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যারা নিজেদের নামাযের ব্যাপারে গাফলতি করে ও লোক দেখানো কাজ করে’- সূরা মাউন।

ঈমান ও আমলের সম্পর্ক বড়ো নিবিড়, পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। মানুষের ঈমান তার আমলের মাঝে প্রকাশ পায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ আমরা কুরআনের কিছু আয়াত উল্লেখ করতে পারি। ‘তুমি কি তাকে দেখেছো যে পরকালের বদলাকে (পুরস্কার ও শাস্তি) মিথ্যা মনে করে? সে তো সেই লোক যে ইয়াতিমকে ধাক্কা দেয় এবং মিসকিনকে খাবার দিতে উদ্বুদ্ধ করে না’- সূরা মাউন ১-৩। ‘নিশ্চিত ধ্বংস তাদের জন্য যারা মানুষকে সামনা-সামনি গালাগাল ও পেছনে দোষ প্রচার করে এবং ধ্বংস তাদেরও জন্য যারা ধনমাল জমা করে ও গুণে গুণে দেখে। তাদের ধারণা, ধনমাল তাদের চিরজীবী করে রাখবে’- সূরা হুমাযা ১-৩। এদের পরিণতি হলো এরা হুতামায় (চূর্ণ-বিচূর্ণকারী স্থান) নিক্ষিপ্ত হবে এবং সেটা আল্লাহর আগুন- সূরা হুমাযা। ব্যক্তির ধনমাল, মান-সম্মান, ক্ষমতা-কর্তৃত্ব কোনকিছু চিরস্থায়ী নয়- এমন উপলব্ধি পরকাল অবিশ্বাসী ব্যক্তির নেই। তাই সে বৈধ-অবৈধ বিচার না করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলে এবং মানুষের প্রতি জুলুম-নির্যাতনে পিছপা হয় না। মানুষকে একটু গালি দেয়া বা পেছনে গিবত করার পরিণতি যদি হয় হুতামা তাহলে গুম-খুন, রিমান্ডে নির্যাতন এবং ভোট ডাকাতি, চাঁদাবাজির পরিণতি কতো ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। রসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করেছেন, ‘ঐ ব্যক্তি মুমিন নয়, মুমিন নয়, মুমিন নয় যার হাত ও মুখের অনিষ্ট থেকে অন্যরা নিরাপদ নয়। কুরআন-হাদিস পড়ে আমার উপলব্ধি, জালেমের জন্য জান্নাতে এক ইঞ্চি পরিমাণ জমিও বরাদ্দ নেই যদি না তাওবা করে। জালেমকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে বড়ো অপমানের সাথে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

আল্লাহপাক নবী-রসুল পাঠিয়েছেন তাঁর দীন কায়েমের মধ্য দিয়ে জমিনে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে। সত্যিকার মুমিন তারাই যারা নবী-রসূলদের পথ অনুসরণ করে দীন কায়েমের চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালায়। আল্লাহপাক ঈমান ও কুফরের মাঝে পার্থক্য টেনেছেন জিহাদকে দিয়ে। তাঁর বাণী, ‘যারা ঈমানের পথ অবলম্বন করেছে তারা লড়াই করে আল্লাহর পথে। আর যারা কুফরির পথ অবলম্বন করেছে তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। কাজেই শয়তানের সঙ্গী-সাথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করো আর বিশ্বাস রেখো, শয়তানের ষড়যন্ত্র আসলেই দুর্বল’- সূরা নেসা ৭৬। এই আয়াতে সত্যিকার মুমিন ও কাফিরের পার্থক্য স্পষ্ট করা হয়েছে। ইসলামই কেবল আল্লাহপাকের মনোনীত একমাত্র দীন এবং এর বাইরে যা কিছু তা সবই তাগুতের দীন বা ব্যবস্থা। ইসলাম ছাড়া যারা অন্য কিছু চায় বা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালায় তারা কাফির (আল্লাহর বিধান অমান্য করে), ফাসিক (অবাধ্য), মুনাফিক (মুখে মুসলিম দাবি করে), মুশরিক (তাগুতের অনুসারী) এককথায় সবকিছুই। ইসলামের প্রাণশক্তি হলো কালিমা তাইয়্যেবাহ- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। কুরআনের ভাষায় বলা যায়, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং তাগুতকে অস্বীকার করো’- সূরা নহল ৩৬। তাগুতকে অস্বীকার ছাড়া আল্লাহকে মানা ঈমানহীনতারই পরিচায়ক।

একজন ব্যক্তি তখনই মুসলিম যখন সে ইসলামকে একমাত্র দীন বা জীবনব্যবস্থা হিসাবে বিশ্বাস করে; ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে পরিপূর্ণভাবে মেনে চলে এবং দীন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালায় ও ইসলামের বিজয় কামনা করে। এর কোনো একটির অভাব থাকলে সে আর মুমিন থাকে না এবং মুসলমানও হতে পারে না। যেমন মুসলমান হতে পারেনি আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই যদিও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পেছনে সে নামায আদায় করেছে, রোজা পালন করেছে ও দান-খয়রাতও করেছে। দীনের বিজয় কামনা কোনো ছোটখাটো আমল নয় বরং এটিই ঈমানের মৌলিক দাবি এবং জিহাদই হলো মুমিন ও মুনাফিকের মাঝে পার্থক্যকারী আমল। আল্লাহপাক মুমিনদেরকে জান্নাতের ওয়াদা করেছেন কিছু নফল ইবাদত বন্দেগির বিনিময়ে নয় বরং নিজের জীবন ও ধনসম্পদ উৎসর্গ করার বিনিময়ে। তাঁর ভাষায়, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের জানমাল খরিদ করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে, তারা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে, মারে ও মরে। তাদের প্রতি (জান্নাত দানের ওয়াদা) তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনে আল্লাহর জিম্মায় একটি পাকাপোক্ত ওয়াদা। আল্লাহর চাইতে বেশি ওয়াদা পালনকারী আর কে আছে? কাজেই তোমরা আল্লাহর সাথে যে কেনা-বেচা করেছো সেজন্য আনন্দ করো। এটিই সবচেয়ে বড়ো সাফল্য।’- সূরা তওবা ১১০।

আমাদের একটি ধারণা জন্মেছে, ইসলাম মানি বা না মানি যেহেতু আমরা মুসলমানের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছি এবং মৃত্যুর পরে ইসলামের বিধি মোতাবেক জানাযা ও দাফন-কাফন হয়ে থাকে তাই আমরা জান্নাতে যাবো। আর শাস্তি ভোগ করলেও সামান্য কিছুদিন মাত্র। এমন ধারণা পোষণ করে ইহুদিরা। কিন্তু কুরআন এতো সহজে জান্নাতে যাওয়ার কথা বলে না। আচার-আচরণ, লেন-দেন ও ব্যবহারিক জীবনে ইসলামের বিধি-বিধান মানার ক্ষেত্রে আমরা বড়ই দুর্বল। মিথ্যা, ধোকা-প্রতারণা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, আমানতে খেয়ানত, অশ্লীল ভাষায় তর্ক-বিতর্ক এমন কোনো অপকর্ম নেই যা জমিনের বুকে মুসলিম নামধারীরা না করে। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া কোনো মুসলমানের পরিচায়ক নয় বরং কাট্টা মুনাফিকের পরিচায়ক যাদের অবস্থান হবে জাহান্নামের সর্বনিম্নস্তরে। তারপরও গর্ব করে বলে পৃথিবীর বুকে তারা নাকি সেরা মুসলিম, তাদের রাজধানী ঢাকা মসজিদের শহর, হজের পরে সবচেয়ে বড়ো জামাত তাদের দেশে অনুষ্ঠিত হয়, আরো কতকিছু নিয়ে তাদের গর্ব। এরা দীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করে নিয়েছে। সমাজে যারা নেতৃত্বের আসনে আসীন তারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে এবং দাবি করে তারাই সত্যিকার ধার্মিক। আর যারা ইসলামকে পরিপূর্ণ মানতে চায় ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠার কথা বলে তাদের প্রতি ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা খড়গহস্ত এবং দুনিয়া থেকে তাদের সরিয়ে দিতে চায়। তাদের ধারণা ধর্ম একটি পবিত্র জিনিস, রাজনীতির মতো নোংরা জায়গায় ধর্মকে টেনে আনা ঠিক নয়। এরা হিটলারের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলসকে গুরু মানে (একটি মিথ্যাকে বারবার বললে সেটি সত্যে পরিণত হয়)। ফলে রাজনীতির অঙ্গনে শুধু দানব সৃষ্টি হয় এবং মানুষ বারবার নির্যাতিত-নিপীড়িত হয় ও জিল্লতির জীবন যাপন করে। আর একটি অংশ রয়েছে রাজনীতি নিরপেক্ষ ধার্মিক। এরা কাজ না করার নাম রেখেছে আমল। সমাজে তাদের অবস্থান থাকা না থাকা সমান বরং অনেক সময় তাদেরকে তাগুতের অনুসারী হিসেবেই দেখা যায়। এই উভয়বিদ সম্পর্কে আল্লাহপাকের সতর্কবাণী, ‘তোমরা কি দীনের কিছু অংশ মানবে এবং কিছু অংশ অমান্য করবে, তাহলে দুনিয়ার জীবনে রয়েছে জিল্লতি ও আখিরাতে রয়েছে ভয়াবহ আজাব’- সূরা বাকারা ৮৫। দুনিয়ার জীবনে আমরা নানাভাবে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছি এবং আখেরাতে যে ভালো কিছু নেই আল্লাহপাক অগ্রিম তা তাঁর কিতাবে বলে দিয়েছেন।

আল্লাহপাকের সেরা সৃষ্টি মানুষ এবং সমগ্র মানবজাতির মাঝে সেরা হলো মুসলিম উম্মাহ। আল্লাহপাকের বাণী, ‘তোমরা সর্বোত্তম দল। তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানব জাতির কল্যাণ সাধনের জন্য। তোমরা ভালো কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজে নিষেধ করবে’- সূরা আলে ইমরান ১১০। আজ আর মুসলিম উম্মাহ আদেশ দানের পর্যায়ে নেই বরং তারা কাফের-মুশরিকদের আদেশানুগত গোলাম হয়ে জিল্লতির জীবন যাপন করছে। রাজনৈতিক কর্তৃত্বের যারা অধিকারী তারাই মূলত শ্রেষ্ঠত্বের আসনে থাকে এবং তারাই সমাজে আদেশ দান করে। প্রিয়তম নবী মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন নামাযের জামাতে ইমাম ও খতিব এবং সেই সাথে ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধান। এককথায়, তিনিই সব এবং তাঁকে ছাড়া কোনকিছু হতো না। বিচার-আচার, যুদ্ধবিগ্রহ এবং বিয়েসাদী-জানাযা সকল ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন। তাঁর জীবনে দীনদারী ও দুনিয়াদারী বলে কোনো বিভাজন ছিল না। রসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের সবকিছু নিয়ে সুন্নাতে রসুল (সা.)। আল্লাহপাক আমাদেরকে উপলব্ধি দান করুন।

লেখক : উপাধ্যক্ষ (অব), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ।