জাতীয় সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিবেক। সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, বিরোধী মতকে মর্যাদা দেওয়া এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ঐকমত্য গড়ে তোলার সবচেয়ে কার্যকর মঞ্চ হলো সংসদ। তাই সংসদ যত প্রাণবন্ত হবে, গণতন্ত্রও তত শক্তিশালী হবে। সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদের কার্যক্রম সে আশারই কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবিল নিয়ে আলোচনার সময় সরকার বিরোধী দলের একাধিক যৌক্তিক প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী গ্রহণ করেছে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, টিআইএন-সংক্রান্ত কয়েকটি বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার এবং অর্থবিলের কিছু ধারা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, সংসদে অর্থবহ আলোচনা হলে নীতিনির্ধারণ আরও জনমুখী ও বাস্তবসম্মত হতে পারে। গণতান্ত্রিক সংসদের সার্থকতা এখানেই, যেখানে বিতর্ককে সংঘাত নয়, বরং উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা হয়।

বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা অবশ্য এতটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণ প্রত্যাশা করেছিল সংসদ হবে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু বাস্তবে বহু সময় সরকার সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে, আবার বিরোধী দলও সংসদ বর্জন, দীর্ঘ অনুপস্থিতি কিংবা কেবল বিরোধিতার রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ফলে জনগণের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সংসদের ভেতরে নয়, রাজপথে নিষ্পত্তির চেষ্টা হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সংসদের মর্যাদা, দুর্বল হয়েছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং আস্থা হারিয়েছে সাধারণ মানুষ।

গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দল প্রতিপক্ষ হতে পারে, কিন্তু তারা রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নয়। একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দল সরকারের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগকে সমর্থন করবে, আবার ভুল সিদ্ধান্ত, দুর্নীতি কিংবা জনস্বার্থবিরোধী নীতির কঠোর সমালোচনাও করবে। একইভাবে একটি আত্মবিশ্বাসী সরকারও বিরোধী দলের প্রতিটি বক্তব্যকে রাজনৈতিক শত্রুতা হিসেবে দেখবে না; বরং যুক্তিসঙ্গত সমালোচনাকে গ্রহণ করার মানসিকতা প্রদর্শন করবে। সংসদীয় গণতন্ত্রের সাফল্য এই পারস্পরিক রাজনৈতিক পরিপক্বতার ওপরই নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক সময়ে সংসদের ভেতরে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে ন্যূনতম সৌজন্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং আলোচনার সংস্কৃতির আভাস মিলছে, তা ইতিবাচক। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরস্পরের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা, ভালো উদ্যোগের প্রশংসা করা এবং ভুলের সমালোচনা করা একটি সুস্থ সংসদীয় সংস্কৃতির লক্ষণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই পরিবর্তন ছোট মনে হলেও এর তাৎপর্য অনেক বড়। কারণ গণতন্ত্র কেবল সংবিধানের বিধানে নয়, রাজনৈতিক আচরণের মধ্য দিয়েই পরিপক্বতা অর্জন করে।

তবে এমন ইতিবাচক পরিবেশ ধরে রাখা হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সংসদে ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। বিতর্ক হবে নীতির প্রশ্নে, ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; যুক্তির ভিত্তিতে, আবেগের বশে নয়। সরকারকে সমালোচনা গ্রহণের উদারতা দেখাতে হবে, আর বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল বিরোধিতার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। সংসদের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব সরকার বা বিরোধী দল, কারও একার নয়; এটি উভয়েরই সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।

বর্তমান সংসদের গুরুত্ব আরও একটি কারণে বিশেষ। এটি জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সংসদ। ফলে এর কার্যকারিতা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। যদি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান সংসদের ভেতরেই খুঁজে নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে অগণতান্ত্রিক প্রবণতা কিংবা কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির জন্য পরিসর সংকুচিত হবে। আর যদি সংসদ আবারও অচলাবস্থা, অসহিষ্ণুতা ও মুখোমুখি সংঘাতের শিকার হয়, তাহলে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে। সর্বোপরি এ সংসদ কার্যকর থাকলে ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ফিরে আসার সুযোগ কমে যাবে।

বাংলাদেশের মানুষ সংঘাতের রাজনীতি নয়, কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়। তারা এমন একটি সংসদ দেখতে চায়, যেখানে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, বিরোধী দলের কণ্ঠস্বর শোনা হবে এবং জাতীয় স্বার্থ দলীয় হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে স্থান পাবে। সাম্প্রতিক ইতিবাচক লক্ষণগুলো সে প্রত্যাশাকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছে। এখন প্রয়োজন এই রাজনৈতিক সৌজন্যকে সাময়িক ঘটনা হিসেবে না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ দেওয়া। সংসদীয় গণতন্ত্রের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নয়, বরং সংলাপ, সহিষ্ণুতা, জবাবদিহি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে। জাতীয় সংসদ যদি সেই চর্চার নির্ভরযোগ্য ঠিকানায় পরিণত হয়, তবে সেটিই হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অর্জন।